ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা
🏵️💠 ইসলামে নারীর অধিকার ও মর্যাদা 💠🏵️
ইসলাম এমন এক পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা, যা নারী ও পুরুষ উভয়কেই আল্লাহ তা'লার বান্দা হিসেবে সমান মানবিক মর্যাদা প্রদান করেছে। ইসলাম-পূর্ব জাহেলী যুগে নারীরা ছিল চরম অবহেলিত ও বঞ্চিত। অনেক সমাজে তাদের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হতো, তাদেরকে সম্পত্তির মতো ক্রয়-বিক্রয় করা হতো, এমনকি কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দেওয়ার মতো নির্মম প্রথাও প্রচলিত ছিল। কিছু সমাজে স্বামী মারা গেলে তার অন্তিম সংস্কার তথা চিতার সঙ্গে জীবিত বিধবা স্ত্রীকেও পুড়িয়ে দেওয়া হতো। এমন এক অন্ধকার যুগে ইসলাম নারীর মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করে তাকে সম্মান, নিরাপত্তা, সম্পত্তির অধিকার, উত্তরাধিকার, শিক্ষা, বিবাহ এবং পারিবারিক জীবনে ন্যায্য অধিকার প্রদান করে।
💠আল্লাহ তা'লা ইরশাদ করেন—
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا
অনুবাদ: "হে মানবজাতি! তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালককে ভয় কর, যিনি তোমাদেরকে এক ব্যক্তি থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তার থেকেই তার সঙ্গিনীকে সৃষ্টি করেছেন।"
{{ সূরাহ আন-নিসা-৪ আয়াত নং-১ }}
এই আয়াত প্রমাণ করে যে, নারী ও পুরুষ উভয়েই একই মানবজাতির অংশ এবং উভয়ের মানবিক মর্যাদা আল্লাহর নিকট সমান।
ইসলাম নারীর সম্মানকে এতটাই গুরুত্ব দিয়েছে যে, মহান আল্লাহ কুরআনে ঘোষণা করেছেন—
وَلَهُنَّ مِثْلُ الَّذِي عَلَيْهِنَّ بِالْمَعْرُوف
অনুবাদ-প্রচলিত ন্যায়নীতি অনুযায়ী নারীদের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি তাদের ওপরও কিছু দায়িত্ব রয়েছে।
{{ সূরাহ আল-বাকারা-২ আয়াত নং-২২৮ }}
এই আয়াত ইসলামের ভারসাম্যপূর্ণ নীতিকে তুলে ধরে। ইসলাম শুধু দায়িত্বের কথা বলেনি; বরং অধিকার ও দায়িত্বের মধ্যে সুন্দর সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করেছে।
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম নারীদের সম্পর্কে বলেন-
مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الآخِرِ فَإِذَا شَهِدَ أَمْرًا فَلْيَتَكَلَّمْ بِخَيْرٍ أَوْ لِيَسْكُتْ وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ فَإِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ وَإِنَّ أَعْوَجَ شَىْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلاَهُ إِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ اسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا
যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং আখিরাতের প্রতি ঈমান রাখে, সে যখন কোন বিষয় প্রত্যক্ষ করবে তখন হয়ত উত্তম কথা বলবে অন্যথায় চুপ থাকবে। আর নারীদের প্রতি কল্যাণের (ও সদাচরণের) অঙ্গীকার গ্রহণ কর। কেননা পাজরের একটি হাড় দিয়ে নারী সৃজিত হয়েছে এবং পাঁজরের সবচেয়ে বেশি বাঁকা হল তার উপরের অংশ। তুমি তাকে সোজা করতে গেলে তা ভেঙ্গে ফেলবে। আর তাকে (যথাবস্থায়) ছেড়ে রাখলে তা সদা বাকা থেকে যাবে। নারীদের প্রতি কল্যাণের নাসীহাত গ্রহণ কর ও অঙ্গীকারাবদ্ধ হও।
{{ সহীহ মুসলিম হাদিস নং-৩৫৩৯,, মিশকাত হাদিস নং-৩২৩৮ }}
রাসূলুল্লাহ ﷺ বিদায় হজের ঐতিহাসিক ভাষণে নারীদের অধিকার সম্পর্কে বিশেষভাবে উপদেশ দিয়ে বলেছেন—
اتَّقُوا اللَّهَ فِي النِّسَاءِ فَإِنَّكُمْ أَخَذْتُمُوهُنَّ بِأَمَانَةِ اللَّهِ
নারীদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। কারণ তোমরা তাদেরকে আল্লাহর আমানত হিসেবে গ্রহণ করেছ।
{{ সহীহ মুসলিম হাদিস নং-১২১৮ }}
أَلاَ وَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ خَيْرًا فَإِنَّمَا هُنَّ عَوَانٌ عِنْدَكُمْ لَيْسَ تَمْلِكُونَ مِنْهُنَّ شَيْئًا غَيْرَ ذَلِكَ إِلاَّ أَنْ يَأْتِينَ بِفَاحِشَةٍ مُبَيِّنَةٍ فَإِنْ فَعَلْنَ فَاهْجُرُوهُنَّ فِي الْمَضَاجِعِ وَاضْرِبُوهُنَّ ضَرْبًا غَيْرَ مُبَرِّحٍ فَإِنْ أَطَعْنَكُمْ فَلاَ تَبْغُوا عَلَيْهِنَّ سَبِيلاً أَلاَ إِنَّ لَكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ حَقًّا وَلِنِسَائِكُمْ عَلَيْكُمْ حَقًّا فَأَمَّا حَقُّكُمْ عَلَى نِسَائِكُمْ أَلاَّ يُوطِئْنَ فُرُشَكُمْ مَنْ تَكْرَهُونَ وَلاَ يَأْذَنَّ فِي بُيُوتِكُمْ لِمَنْ تَكْرَهُونَ أَلاَ وَحَقُّهُنَّ عَلَيْكُمْ أَنْ تُحْسِنُوا إِلَيْهِنَّ فِي كِسْوَتِهِنَّ وَطَعَامِهِنَّ
স্ত্রীদের সাথে ভালো আচরণের উপদেশ নাও। তোমাদের নিকট তারা বন্দীর মত। তাছাড়া তোমাদের আর কোন অধিকার নেই তাদের উপর, কিন্তু তারা যদি সুস্পষ্ট চরিত্রহীনতায় লিপ্ত হয় (তবে ভিন্ন কথা)। তারা যদি তাই করে তাহলে তাদের বিছানাকে আলাদা করে দাও এবং সামান্য প্রহার কর, মারাত্মক প্রহার নয়। যদি তারা তোমাদের অনুগত হয় তাহলে তাদেরকে নির্যাতনের অজুহাত খুঁজতে যেও না। জেনে রাখ! তোমাদের যেমন তোমাদের স্ত্রীদের প্রতি অধিকার আছে, তাদেরও তোমাদের প্রতি ঠিক সেরকমই অধিকার আছে। তাদের প্রতি তোমাদের অধিকার এই যে, তোমরা যাদেরকে পছন্দ কর না তারা যেন সেসব লোককে দিয়ে তোমাদের বিছানা পদদলিত না করায় এবং যেসব অনুমতি না দেয়। জেনে রাখ! তোমাদের প্রতি তাদের অধিকার এই যে, তোমরা তাদের উত্তম পোশাক-পরিচ্ছদ ও ভরণপোষণের ব্যবস্থা করবে।
{{ সুনানে তিরমিযী হাদিস নং-১১৬৩ }}
শিক্ষা: স্ত্রী স্বামীর সম্পত্তি নয়; তিনি আল্লাহর অর্পিত আমানত। এটি প্রমাণ করে যে, স্ত্রীর সঙ্গে সদাচরণ করা ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ।
এছাড়া, ইসলামে নারীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধিকার হলো শিক্ষার অধিকার। জ্ঞান অর্জন নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ ফরয। দ্বীনি জ্ঞান, ইবাদতের বিধান এবং নৈতিক শিক্ষা অর্জনের মাধ্যমে একজন নারী নিজেকে, পরিবারকে এবং সমাজকে কল্যাণের পথে পরিচালিত করতে পারেন।
ইসলাম নারীর সম্পত্তির অধিকারও নিশ্চিত করেছে। বিবাহের পরও নারীর নিজস্ব সম্পদের মালিকানা অক্ষুণ্ণ থাকে। স্বামী তার স্ত্রীর সম্পদের মালিক হয়ে যায় না। একইভাবে ইসলাম নারীর জন্য উত্তরাধিকারের অংশ নির্ধারণ করেছে, যা সেই সময়ের সমাজব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন ছিল।
এছাড়া ইসলাম নারীর মোহরের অধিকার নিশ্চিত করেছে।
আল্লাহ তা'লা বলেন—
وَآتُوا النِّسَاءَ صَدُقَاتِهِنَّ نِحْلَةً
অনুবাদ-তোমরা স্ত্রীদের তাদের মোহর সন্তুষ্টচিত্তে প্রদান কর।
{{ সূরাহ আন-নিসা-৪ আয়াত নং-৪ }}
মোহর স্ত্রীর বৈধ অধিকার। এটি কোনো দান বা অনুগ্রহ নয়; বরং বিবাহের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি শরয়ী দায়িত্ব।
ইসলাম নারীর ভরণ-পোষণ, নিরাপত্তা ও সম্মানজনক জীবনযাপনের অধিকারও নিশ্চিত করেছে। স্বামীর ওপর স্ত্রীর খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান এবং প্রয়োজনীয় ব্যয়ের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে। আবার কন্যা হিসেবে নারী পিতা-মাতার স্নেহ ও লালন-পালনের অধিকারী, মা হিসেবে তিনি সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারিণী এবং বোন হিসেবে ভালোবাসা ও সহযোগিতা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
বিশেষ করে মায়ের মর্যাদা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন—
أُمُّكَ ثُمَّ أُمُّكَ ثُمَّ أُمُّكَ ثُمَّ أَبُوكَ
প্রথমে তোমার মা, তারপর তোমার মা, তারপর তোমার মা, এরপর তোমার বাবা।
{{ সহীহ মুসলিম }}
এ হাদিস প্রমাণ করে যে, ইসলামে নারী যখন মা হিসেবে ভূমিকা পালন করেন, তখন তাঁর মর্যাদা অত্যন্ত উচ্চে উন্নীত হয়।
সম্মানিত সুধী!
বর্তমান যুগে কখনো ইসলামের নামে নারীর প্রতি অন্যায় করা হয়, আবার কখনো নারীর অধিকার প্রতিষ্ঠার নামে ইসলামের সীমারেখা অতিক্রম করা হয়। উভয় পথই সঠিক নয়। ইসলাম নারীকে সম্মান, নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার এবং মর্যাদাপূর্ণ জীবন দিয়েছে। তাই আমাদের কর্তব্য হলো কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে নারীর প্রকৃত অধিকার সম্পর্কে সচেতন হওয়া এবং সমাজে তা বাস্তবায়নের চেষ্টা করা।
মনে রাখতে হবে, একজন নারী কারও কন্যা, কারও বোন, কারও স্ত্রী এবং কারও মা। তাই তাঁর সম্মান রক্ষা করা, তাঁর বৈধ অধিকার আদায় করা এবং তাঁর প্রতি ন্যায়বিচার করা একজন মুমিনের ঈমানি দায়িত্ব।
আল্লাহ তা'লা আমাদের সকলকে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একে অপরের অধিকার যথাযথভাবে আদায় করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
✍️*খাদিমুল হাদীস মুফতী আমজাদ হুসাইন সিমনানী সাহেব*
📚*নোট*:- লেখকের নাম উল্লেখ না করে লেখাটি কপি বা শেয়ার করা নিষিদ্ধ।
Comments -