হারাম টাকা দিয়ে কুরবানী করলে কুরবানী হবে কি না?
প্রশ্ন:- হারাম টাকা দিয়ে কুরবানী করলে কুরবানী হবে কি না?
*উত্তর:- হারাম টাকা যে কোনো কাজে ব্যয় করা হারাম। সেটা ধর্মীয় কাজ হোক অথবা পার্থিব কাজ। তার বিধান হল যার নিকট থেকে অর্জন করেছেন, তাকে ফেরত দিয়ে দেওয়া, সে না থাকলে তার ওয়ারিসদের দিয়ে দেওয়া, তারা যদি না থাকে বা অনুসন্ধান না পাওয়া যায় তাহলে ফকিরের প্রতি সাদকাহ করে দেওয়া। এ ছাড়া অন্য কোনো কাজ করা যাবে না।
তবে যদি কেউ হারাম টাকা দিয়ে কুরবানী করে ফেলে তাহলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে কিন্তু সেই কুরবানী আল্লাহ পাক কবুল করবেন না।
অনুরূপভাবে যদি কেউ হারাম টাকা দিয়ে কারও সাথে কুরবানীতে শরীক হয়, তাহলে তার ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে সাথে সাথে তার সাথে অংশগ্রহণকারীদের কুরবানী শুদ্ধ হবে। কারণ, হারাম টাকার অপবিত্রতা জন্তুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে না।
এ প্রসঙ্গে ফুক্বাহায়ে কেরাম একটি নীতি বর্ণনা করেছেন যে, ক্রয় করার সময় যদি عقد (চুক্তি) এবং نقد (যে টাকা নগদ প্রদান করা হয়) একত্রিত হয়ে যায়, তাহলে মাল বা সম্পদের অপবিত্রতা ক্রয়কৃত বস্তুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে। আর যদি হারাম সম্পদে عقد এবং نقد একত্রিত না হয়; বরং হারাম টাকা বা সম্পদের প্রতি عقد বা চুক্তি হয় অথবা হারাম সম্পদ নগদ আদায় করে তাহলে হারাম সম্পদের অপবিত্রতা ক্রয়কৃত বস্তুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে না। عقد এবং نقد একত্রিত হওয়ার অর্থ:
ক্রয় করার সময় দু হাজার টাকার নোট দেখিয়ে একথা বলা যে, "আমি এ দু হাজার টাকা (আসলে সেই দু হাজার টাকার নোট হারামের অন্তর্ভুক্ত) -এর বদলে আপনার এই ছাগল ক্রয় করলাম।" পক্ষান্তরে বিক্রেতা কবুল করে নিল। এতে যেহেতু হারাম টাকার উপরই চুক্তি হল আর সেই হারাম টাকা আবার নগদ আদায় করা হল, ফলে ক্রয় করার সময় عقد এবং নقد উভয় একত্রিত হয়ে গেল। এজন্য ঐ হারাম টাকার অপবিত্রতা জন্তুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে যাবে। কিন্তু আজকাল সাধারণভাবে ক্রয় করার যে নিয়ম প্রচলিত রয়েছে, তাতে عقد এবং نقد একত্রিত হয় না। কারণ, ক্রয় করার সময় ক্রেতা টাকা দেখিয়ে এ কথা বলে না যে, "আমার হাতে এই যে টাকা রয়েছে তার বদলে আপনার এই ছাগল ক্রয় করলাম" এ কথা বলে না। বরং এমনিতেই জিনিস ক্রয় করে আর পকেট থেকে বের করে টাকা প্রদান করে। এতে হারাম টাকার উপর (نقد) নগদ তো পাওয়া গেল কিন্তু চুক্তি পাওয়া গেল না। এ জন্য হারাম টাকার অপবিত্রতা জন্তুর মধ্যে অনুপ্রবেশ করবে না।
হুযূর আদ্বলা হযরত রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু লিখেছেন:
فَإِذَا لَمْ يَجْتَمِعْ عَلَيْهَا الْعَقْدُ وَالنَّقْدُ لَمْ يَسْرِ الْخُبْثُ إِلَى الْمَالِ الْبَدَلِ كَمَا هُوَ عِنْدَ الْإِمَامِ الْكَرْخِيِّ وَعَلَيْهِ الْفَتْوَى
অনুবাদ:- হারাম সম্পদের প্রতি যদি عقد (চুক্তি) এবং نقد (যে টাকা নগদ প্রদান করা হয়) একত্রিত না হয়, তাহলে অপবিত্রতা বদল (আদান প্রদানকৃত বস্তু) -এর মধ্যে অনুপ্রবেশ করে না। যেমন, ইমাম কারখী রহমতুল্লাহি তা'আলা আলাইহির মতামত, আর এর উপর ফাতওয়া রয়েছে।
(ফাতওয়া রাযাবীয়াহ, খন্ড: 23, পৃষ্ঠা:562, প্রকাশিত রেযা ফাউন্ডেশন, লাহোর)
সিরাজুল ফুক্বাহা, মুহাদ্দিসীনে মাসায়েলে জাদীদাহ হযরত আল্লামা মাওলানা মুফতি মুহাম্মদ নযামুদ্দীন রেযভী মিসবাহী (শায়খুল হাদিস, আল-জামেয়াতুল আশরাফিয়া মুবারকপুর, আজমগড়, ইউপি) দামা যিল্লুহুল আলী বলেন:
"হারাম সম্পদ অর্জন করা হারাম। তা ধার্মিক অথবা পার্থিব কাজে ব্যয় করাও হারাম। এরূপ ব্যক্তির প্রতি আবশ্যিক যে, যার নিকট থেকে অন্যায় ভাবে হারাম সম্পদ অর্জন করেছেন তাকে ফেরত দিবেন, সে না থাকলে তার ওয়ারিসদের দিয়ে দিবেন, কেউ না দিলে কাল কিয়ামতের দিন মালিককে তার নেকীগুলি দিয়ে দেওয়া হবে। এরপরও যদি কোনো ব্যক্তি আল্লাহর ভয় অন্তরে না রেখে হারাম সম্পদ দিয়ে কুরবানীতে অংশগ্রহণ করে নেয় তাহলে ওয়াজিব আদায় হয়ে যাবে এবং (তার সাথে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যও) সকলের কুরবানীর শুদ্ধ হবে।" (মাহনামা আশরাফিয়া, অক্টোবর 2018, পৃষ্ঠা নং 20)
হাদিস শরীফে রয়েছে -
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَآلِهِ وَسَلَّمَ أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
অনুবাদ:- হযরত আবু হুরায়রাহ্ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু থেকে বর্ণিত:
তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন: হে মানুষ সকল ! আল্লাহ তাআলা পবিত্র। তিনি পবিত্র জিনিস ব্যতীত কিছু কবুল করেন না।
(তিরমিযি শরীফ, হাদিস: 2989)
প্রকাশ থাকে যে, কোনো জিনিস দায়িত্ব থেকে নেমে যাওয়া আলাদা বিষয় আর তা কবুল হওয়া এটা আলাদা বিষয়। যেমন- হারাম টাকা দিয়ে হজ্জ করলে "ফরয" দায়িত্ব থেকে নেমে যায়; কিন্তু সেই হজ্জ কুবুল করা হয় না। তদ্রূপ হারাম টাকা দিয়ে কুরবানী করলে "ওয়াজিব" দায়িত্ব থেকে নেমে যায়; কিন্তু সেই কুরবানী কবুল করা হয় না।
والله تعالى و رسوله أعلم بالصواب عز و جل ও صلى الله عليه و سلم
ইতি
☀️মুফতি গুলজার আলী মিসবাহী☀️
হেমতাবাদ, উত্তর দিনাজপুর, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।
24/11/1443 হিজরী
25/06/2022 খ্রিস্টাব্দ
Comments -