কোরআনের আলোকে জাহান্নামের ভয়াবহতা
কোরআনের আলোকে জাহান্নামের ভয়াবহতা
নাম: কালিমুদ্দিন সেখ, (মুর্শিদাবাদ)
পাঠরত আল জামিয়াতুল আশরাফিয়া
(নভেম্বর মাসের জন্য)
“জাহান্নাম” শব্দটি মনে আসলেই মানুষের শরীরে ভয় আর আতঙ্কের স্রোত বয়ে যায়। আল্লাহ তাআলা গুনাহগার ও অবাধ্যদের জন্য এমন এক শাস্তির জায়গা বানিয়েছেন যার কষ্ট-কঠিনতা মানুষের কল্পনারও বাইরে। এটা এমন এক কারাগার যেখানে অপরাধী মৃত্যু চাইবে, কিন্তু মৃত্যু তাকে দেওয়া হবে না।
সে বারবার মৃত্যুর মতো কষ্ট ভোগ করবে, চারপাশে মৃত্যু ঘুরে বেড়াবে, তবুও সে মরতে পারবে না। তৃষ্ণায় কাতর জাহান্নামিদেরকে যখন আহত শরীর থেকে বের হওয়া দুর্গন্ধযুক্ত পুঁজ ও রক্ত পান করানো হবে, তখন তার যন্ত্রণার অবস্থা ভাষায় প্রকাশ করা অসম্ভব।
আল্লাহ তাআলা কোরআন শরীফের মধ্যে ইরশাদ করেন:
﴿مِّن وَرَآئِهِ جَهَنَّمُ وَيُسْقَىٰ مِن مَّآءٍ صَدِيدٍ يَتَجَرَّعُهُ وَلَا يَكَادُ يُسِيغُهُ وَيَأْتِيهِ الْمَوْتُ مِن كُلِّ مَكَانٍ وَمَا هُوَ بِمَيِّتٍ وَمِن وَرَآئِهِ عَذَابٌ غَلِيظٌ﴾
অর্থাৎ: জাহান্নাম তার পেছনে লেগে আছে এবং তাকে পুঁজের পানি পান করানো হবে। অতি কষ্টে তা থেকে অল্প অল্প করে গলাধঃকরণ করবে এবং গলার নিচে অবতরণ করানোর আশাই থাকবেনা এবং তার নিকট চতুর্দিক থেকে মৃত্যু আসবে আর সে মরবে না; এবং তার পেছনে একটা কঠিন শাস্তি ।
(সূরা ইবরাহীম, আয়াত: ১৬-১৭)
উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বিখ্যাত তাফসিরবীদ সাদরুল আফাযিল সৈয়্যদ মহাম্মদ নাঈম উদ্দিন মোরাদাবাদী খাযাইনুল ইরফান এর মধ্যে বলেন
হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে যে, জাহান্নামবাসীকে পুঁজের পানি পান করানো হবে। তা যখন তাদের মুখের নিকট আসবে তখন তা তাদের নিকট খুবই অসহনীয় অনুভূত হবে। যখন আরো নিকটবর্তী হবে তখন তাতে তাদের চেহারা জ্বলে ভুনে যাবে এবং মাথা পর্যন্ত চামড়া জ্বলে খসে পড়বে। আর যখন পান করবে তখন নাড়িভুঁড়ি কেটে বের হয়ে যাবে।
আমরা দুনিয়ার আগুনে পুড়ে যাওয়া মৃতদেহ দেখলে শিহরিত হয়ে উঠি। দুর্বল হৃদয় ও স্নায়ুর মানুষ তো পোড়া লাশের দিকে তাকাতেই পারে না। একটু ভেবে দেখুন, জাহান্নামের আগুনে পোড়ার কষ্ট কত ভয়াবহ হবে!
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ:
«نَارُكُمْ جُزْءٌ مِنْ سَبْعِينَ جُزْءًا مِنْ نَارِ جَهَنَّمَ»
قِيلَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، إِنْ كَانَتْ لَكَافِيَةً.
قَالَ: «فُضِّلَتْ عَلَيْهِنَّ بِتِسْعَةٍ وَسِتِّينَ جُزْءًا، كُلُّهُنَّ مِثْلُ حَرِّهَا»
অর্থাৎ:
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
“তোমাদের দুনিয়ার আগুন জাহান্নামের আগুনের সত্তর ভাগের একটি ভাগ মাত্র। সাহাবারা বললেন, হে আল্লাহর রাসুল, দুনিয়ার আগুনই তো যথেষ্ট কষ্টদায়ক! রাসুল ﷺ বললেন, জাহান্নামের আগুন তার চেয়ে ঊনসত্তর গুণ বেশি উত্তপ্ত।”
(সহিহ বুখারি: ৩২৬৫)
জাহান্নাম কত গভীর, তা বুঝতে নিচের হাদিস যথেষ্ট:
হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা একবার রাসুলুল্লাহ ﷺ এর সঙ্গে ছিলাম। হঠাৎ আমরা এক প্রচণ্ড শব্দ শুনতে পেলাম। নবী ﷺ বললেন, “তোমরা জান কি এই শব্দটা কী?” আমরা বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসুলই ভালো জানেন রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করলেন:
“এটা হলো এক পাথর, যা সত্তর বছর আগে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হয়েছিল। সেই থেকে তা ক্রমাগত নিচে পড়ছিল। অবশেষে আজ গিয়ে জাহান্নামের তলদেশে পৌঁছেছে।”
(সহিহ মুসলিম: ৭০৬২)
অর্থাৎ, জাহান্নাম এতটাই গভীর যে সেখানে একটি পাথর টানা সত্তর বছর পড়তে পড়তে অবশেষে তলদেশে পৌঁছেছে।
এমনকি ক্ষুধা আর তৃষ্ণায় কাহিল জাহান্নামীদের খাবার হিসেবে যাক্কুম গাছ দেওয়া হবে। এটার বর্ননা আল্লাহ তাআলা এরুপ দিয়ছেন —
إِنْ شَجَرَتَ الزقُومِ * طَعَامُ الْآثِيمِ * كَالْمُهْلِ يَغْلِي فِي الْبُطُونِ * كَغَلْي الْحَمِيمِ
অর্থাৎ: নিশ্চয়ই যাক্কুম বৃক্ষ হবে পাপীর খাদ্য। গলিত তাম্রের ন্যায় উদর গুলোর মধ্যে ফুটতে থাকবে, যেমন উত্তপ্ত পানি ফুটে থাকে।
(সূরা আদ-দোখান: ৪৩-৪৬)
বিখ্যাত তাফসিরবীদ সাদরুল আফাযিল সৈয়্যদ মহাম্মদ নাঈমুদ্দিন মোরাদাবাদী নিজ তাফসীর গ্রন্থ "খাযাইনুল ইরফান'' পৃষ্ঠা নং ৮৯০ এ উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
যাক্কুম' একটা অতি
তিক্ত বৃক্ষ, যা জাহান্নামিদের খাদ্য হবে। হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে যে, যদি ঐ যাক্কুম ফলের মাত্র এক ফোঁটা রস ও দুনিয়াতে ফেলা হয় তবে সকল দুনিয়াবাসির জীবন বিনষ্ট হয়ে যাবে।
এ ছাড়া ও জাহান্নামীদের করুণ অবস্থা আরো বিভিন্ন স্থানে বর্ণিত রয়েছে:
যেমন আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّا أَعْتَدْنَا لِلظَّلِمِينَ نَارًا أَحَاطَ بِهِمْ سُرَادِقُهَا وَإِنْ يُسْتَغِيثُوا يُغَاثُوا بِمَاء كَالْمُهْلِ يَشْوِي الْوُجُوهَ بِئْسَ الشَّرَابُ وَسَاءَتْ مُرْتَفَقًا
অর্থাৎ: নিশ্চয় আমি অত্যাচারিদের জন্য ঐ আগুন প্রস্তুত করে রেখেছি, যার দেয়ালসমূহ তাদেরকে পরিবেষ্টন করে নেবে এবং যদি পানির জন্য ফরিয়াদ করে তবে তাদের ফরিয়াদ পূর্ণ করা হবে ঐ পানি দ্বারা, যা গলিত ধাতুর ন্যায়, যা তার মুখমন্ডল ভুনে ফেলবে। কতই নিকৃষ্ট পানীয় এবং দোযখ কতই নিকৃষ্ট অবস্থানের জায়গা।
বিখ্যাত তাফসিরবীদ সাদরুল আফাযিল সৈয়্যদ মহাম্মদ নাঈম উদ্দিন মোরাদাবাদী উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ইরশাদ করেন:
হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা বলেন:
তা হচ্ছে দূষিত পানি, যায়তুন
তেলের গাদের মতো । তিরমিযী শরীফের হাদীসে বর্ণিত হয় যে, যখন তা মুখের নিকটস্থ করা হবে তখন মুখের চামড়া সেটার উত্তাপে জ্বলে নিচে খসে পড়বে । কোনো কোনো
তাফসীরকারক বলেন যে, তা হবে গলিত রাঙ্গাত ও পিতল ।
(খাযাইনুল ইরফান পৃষ্ঠা নং ৫৪১)
জাহান্নাম এমন এক কারাগার, যেখানে কয়েদিদের পোশাকও হবে ভিন্ন রকম। জাহান্নামীদের পোশাক আগুন দিয়ে বানানো হবে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
فَالَّذِينَ كَفَرُوا قُطِّعَتْ لَهُم ثِيَابٌ مِّن نَّارٍ يُصَبُّ مِنْ فَوْقِ رُءُوسِهِمُ الْحَمِيمُ * يُصْهَرُ بِهِ مَا فِي بُطُونِهِمْ وَالْجُلُودُ * وَلَهُمْ مَّقَامِعُ مِنْ حَدِيدٍ
অর্থাৎ: সুতরাং কাফেরদের জন্য আগুনের কাপড় কর্তন করা হয়েছে।
এবং তাদের মাথার উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দেয়া হবে ,যা দ্বারা বিগলিত হবে যা কিছু তাদের উদরে থাকে এবং তাদের চর্মসমূহ , এবং তাদের জন্য লোহার মুগ্দর রয়েছে।
(সুরা আল-হাজ্জ ১৯-২১)
সেই কয়েদিদের বিছানা আর চাদরও হবে আগুনের তৈরি।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
لَهُمْ مِّنْ جَهَنَّمَ مِهَادٌ وَمِنْ فَوْقِهِمْ غَوَاشٍ وَكَذَلِكَ نَجْزِي الظَّلِمِينَ
অর্থাৎ: তাদের জন্য আগুনই বিছানা এবং আগুনই উপরের আচ্ছাদান এবং যালিমদেরকে আমি এভাবেই প্রতিফল দিয়ে থাকি।
(সুরা আল-আ-রাফ আয়াত নং ৪১)
উপরে নিচে সব দিক থেকে আগুন তাদেরকে অবরোধ করে থাকবে
জাহান্নামের ভয়াবহ যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে জাহান্নামীরা জাহান্নামের ফেরেশতার কাছে মৃত্যুর জন্য প্রার্থনা করবে।
وَنَادَوْا يٰمٰلِكُ لِيَقْضِ عَلَيْنَا رَبُّكَ قَالَ إِنَّكُمْ مُكِثُونَ
অর্থাৎ: তারা (জাহান্নামের দারোগাকে) ডেকে বলবে হে মালিক তোমার প্রতিপালক যেন আমাদের নিঃশেষ করেদেন ( মৃত্যু দিয়ে দেন) তিনি (হাজার বছর পর) উত্তর দিবেন : তোমাদেরকে তো অবস্থান করতে হবে।
(সুরা আয্- যুখরুফ আয়াত নং ৭৭)
তারা সর্বদাই শাস্তিতে লিপ্ত থাকবে, কখনো তা থেকে মুক্তি পাবে না। না মৃত্যু দ্বারা না অন্য কোন পন্থায়।
জাহান্নামের অন্ধকার ও সঙ্কীর্ণ কারাগারে জাহান্নামীরা মৃত্যু চাইবে। কিন্তু তাদের মৃত্যু হবেনা ।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
وَإِذَا الْقُوا مِنْهَا مَكَانًا ضَيْقًا مُقَرَّنِينَ دَعَوْا هُنَالِكَ ثُبُورًا * لَا تَدْعُوا الْيَوْمَ تُبُورًا واحدًا وَادْعُوا تُبُورًا كَثِيرًا
অর্থাৎ: এবং যখন তাদেরকে সেটার কোন সংকীর্ণ স্থানে নিক্ষেপ করা হবে (যা অতীব কষ্ট ও অস্থারিতা সৃষ্টিকারী হবে) লৌহ শৃংখলে আবদ্ধ অবস্থায় (এ ভাবে যে তাদের হাত তাদের গর্দানের সাথে মিলিয়ে বেঁধে দেয়া হবে। অথবা এ ভাবে যে প্রত্যেক কাফের আপন আপন শয়তানের সঙ্গে শৃংখলে আবদ্ধ থাকবে।) তখন তারা সেখানে মৃত্যু কামনা করবে, ইরশাদ করা হবে আজ এক মৃত্যু কামনা করো না, আরো বহু মৃত্যু কামনা করো ( কেননা তোমরা বিভিন্ন ধরনের শাস্তিতে লিপ্ত হবে)
(সুরা আল-ফুরক্বান আয়াত নং ১৩-১৪)
জাহান্নামের আগুনে যখন তাদের চামড়া পুড়ে যাবে, তখন আবার নতুন চামড়া তাদের গায়ে পরিয়ে দেওয়া হবে, যাতে তারা বারবার সেই শাস্তির যন্ত্রণা অনুভব করতে পারে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا بِأَيٰتِنَا سَوْفَ نُصْلِيهِمْ نَارًا كلَّمَا نَضِجَتْ جُلُودُهُمْ بَدَّلْنٰهُمْ جُلُودًا غَيْرَهَا لِيَذُوقُوا الْعَذَابَ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَزِيزًا حَكِيمًا
অর্থাৎ: যারা আমার আয়াত সমূহ কে অস্বীকার করেছে অনতিবিলম্বে আমি তাদেরকে আগুনে প্রবেশ করাবো। যখন তাদের চামড়া দগ্ধ হয়ে যাবে তখন আমি তাদেরকে সেগুলোর স্থলে অন্য চামড়া বদলে দেব, যাতে শাস্তির স্বাদ গ্রহণ করে। নিশ্চয় আল্লাহ পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়
(সুরা আন- নিসা আয়াত নং ৫৬)
প্রিয় মুসলমান ভাইয়েরা,
এগুলো কেবল কুরআন ও হাদিসের আলোকে জাহান্নামের ভয়াবহতার কিছু ঝলক মাত্র। কতই না অজ্ঞ সেই মানুষ, যে এসব ভয়াবহতা জানার পরও নিজেকে এবং নিজের পরিবারকে জাহান্নাম থেকে বাঁচানোর চেষ্টা করে না।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا قُوا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيكُمْ نَارًا وَقُودُهَا النَّاسُ وَالْحِجَارَةُ عَلَيْهَا مَلٰٓئِكَةٌ غِلَاظٌ شِدَادٌ لا يَعْصُونَ اللهَ مَا أَمَرَهُمْ وَيَفْعَلُونَ مَا يُؤْمَرُونَ
অর্থাৎ: হে ঈমানদারগণ! নিজেদেরকে ও নিজেদের পরিবারবর্গকে ঐ আগুন থেকে রক্ষা করো ( আল্লাহ তা'আলা ও তাঁর রসূলের আনুগত্য অবলম্বন করে, ইবাদতসমূহ পালন করে, পাপাচার থেকে বিরত রয়ে,
পরিবার-পরিজনকে সৎকর্মের প্রতি পথ-প্রদর্শন ও মন্দ কাজে বাধা প্রদান করে এবং তাদেরকে জ্ঞান ও আদব শিক্ষা দিয়ে) যার ইন্ধন হচ্ছে মানুষ ও পাথর। যার উপর কঠোর নির্মম ফিরিশতাগণ নিয়োজিত রয়েছেন, যারা আল্লাহ এর নির্দেশ অমান্য করে না এবং যা তাদের প্রতি আদেশ হয়, তাই করে।
(সুরা আত- তাহরীম আয়াত নং ৬)
হায়! যদি আমরা এই সত্যটা বুঝতে পারতাম যে, দুনিয়ায় শুধু ধন-সম্পদ আর সম্মান পাওয়াই সফলতা নয়। আসল সফলতা হলো— মানুষ যদি জাহান্নামের আযাব থেকে বাঁচতে পারে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
كُلُّ نَفْسٍ ذَائِقَةُ الْمَوْتِ وَإِنَّمَا تُوَفَّوْنَ أُجُورَكُمْ يَوْمَ الْقِيمَةِ فَمَنْ زُحْزِحَ عَنِ النَّارِ وَأُدْخِلَ الْجَنَّةَ فَقَدْ فَازَ وَمَا الْحَيٰوةُ الدُّنْيَا إِلَّا مَتَاعُ الْغُرُورِ
অর্থাৎ: প্রতেককে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করতে হবে এবং তোমাদের কর্মফল কিয়ামতের দিনে পূর্ণ মাত্রায় মিলবে। যাকে আগুন থেকে রক্ষা করে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়েছে, সে উদ্দেশ্য স্থলে পৌঁছেছে এবং পার্থিব জীবন তো এ ধোকারই সম্পদ
(সুরা আলে ইমরান আয়াত নং: ১৮৫)
হুযুর সাদরুল আফাযিল সৈয়্যদ মহাম্মদ নাঈম উদ্দিন মোরাদাবাদী খাযাইনুল ইরফান'' এর মধ্যে উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন:
দুনিয়ার বাস্তবতাকে এ বরকতময় বাক্য খুলে দিয়েছে। মানুষ পার্থিব জীবনের উপর বিমোহিত হয়, এবং সময় সুযোগকে অনর্থক বিনষ্ট করে দেয়। শেষ মুহূর্তে সে বুঝতে পারে যে, তাতে স্থায়িত্ব ছিলো না এবং সেটার প্রতি আসক্ত হওয়া স্থায়ী জীবন ও পরকালীন জিন্দেগীর জন্য হিতকর হয়েছে।
হযরত সা'ঈদ ইবনে জুবায়ির রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, 'দুনিয়া, দুনিয়া প্রত্যাশীদের জন্য ধোকার সামগ্রী। এবং প্রতারণার পুঁজি মাত্র, কিন্তু আখিরাতকামির জন্য স্থায়ী সম্পদ অর্জনের মাধ্যম এবং মঙ্গলময় পুঁজিই।" এ বিষয়বস্তুটা এ আয়াতের পূর্ববর্তী কতিপয় বাক্য থেকে প্রতিভাত হয়।
কিন্তু মনে রাখবেন — নিজের ইচ্ছা-বাসনা অনুসরণ করে আমরা দোজখের আগুন থেকে বাঁচতে পারব না। দোজখ থেকে বাঁচার জন্য আমাদের নিজের ইচ্ছে ত্যাগ করে আল্লাহ্ ও তাঁর রাসূলের পথ অনুসরণ করতে হবে। আমাদের হৃদয়ে রবের সামনে জবাবদিহিতার অনুভূতি জাগিয়ে তুলতে হবে। তখনই আমরা দোজখ থেকে বাঁচতে পারব এবং জান্নাতে প্রবেশের যোগ্য হতে পারব।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন
فَأَمَّا مَنْ طَغَى * وَأَثَرَ الْحَيُوةَ الدُّنْيَا * فَإِنَّ الْجَحِيمَ هِيَ الْمَأْوَى * وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى * فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَاوَى
অর্থাৎ: অতঃপর যে ব্যক্তি অবাধ্যতা প্রকাশ করেছে এবং পার্থিব জীবনকে প্রাধান্য দিয়েছে,
সুতরাং নিশ্চয় জাহান্নামই তার ঠিকানা। আর সেই ব্যক্তি, যে আপন প্রতিপালকের সামনে দাঁড়াবার ভয় করেছে এবং নাফসকে (মন) কু-প্রবৃত্তি থেকে বিরত রেখেছে,
তবে, নিশ্চয় জান্নাতই তার ঠিকানা।
(সুরা আন নাযিয়াত আয়াত নং ৩৭-৪১)
উপসংহার
জাহান্নামের ভয়াবহতার আলোচনা নিছক ভয় দেখানোর জন্য নয়, বরং আমাদের জন্য তা এক অমূল্য নসীহত ও শিক্ষা। দুনিয়ার সামান্য স্বার্থের পেছনে ছুটে আমরা যদি আল্লাহর আনুগত্য থেকে দূরে সরে যাই, তবে আখিরাতে তার ফল হবে অকল্পনীয় শাস্তি। আল্লাহ তাআলা কুরআনে ও নবী করীম ﷺ হাদীসে বারবার আমাদের সতর্ক করেছেন যেন আমরা নিজেদেরকে ও আমাদের পরিবারকে ঐ ভয়ঙ্কর আগুন থেকে বাঁচাই।
সুতরাং আসল বুদ্ধিমানের কাজ হলো দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী মোহে না ভেসে গিয়ে আখিরাতের স্থায়ী জীবনের প্রস্তুতি নেওয়া। পাপাচার থেকে বেঁচে থাকা, আল্লাহর হুকুম ও রাসূল ﷺ এর সুন্নাহ আঁকড়ে ধরা—এটাই একমাত্র আমাদের মুক্তির পথ।
যে ব্যক্তি আল্লাহর ভয় স্বরণে রাখবে, নিজের নফসকে নিয়ন্ত্রণ করবে এবং সৎকর্মে জীবন কাটাবে—তারই জন্য জান্নাতের চিরস্থায়ী নেয়ামত অপেক্ষা করছে। আর যে দুনিয়াকে আখিরাতের ওপরে প্রাধান্য দেবে, তার জন্যই রয়েছে জাহান্নামের ভয়াবহ শাস্তি।
আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে তাঁর অসন্তুষ্টি থেকে বাঁচিয়ে রাখুন, আমাদের অন্তরে তাওবা ও ভালো কাজ করার ভাব জাগিয়ে দিন এবং তাঁর অশেষ রহমতে জান্নাতুল ফিরদাউস দান করুন। আমীন।
Comments -