“সে হতভাগা, যে তার মা-বাবার বার্ধক্যে তাদের পায় কিন্তু জান্নাতে প্রবেশ করতে পারে না।” (সহীহ মুসলিম) (২) আত্মীয়-স্বজনের সাথে সম্পর্ক বজায় রাখা (সিলা রহমি): আত্মীয়দের সাথে ভালো ব্যবহার করতে হবে। সম্পর্ক ছিন্ন করা হারাম। হাদীস: নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন: > “যে ব্যক্তি চায় তার রিজিক বেড়ে যাক এবং আয়ু দীর্ঘ হোক, সে যেন আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক ভালো রাখে।” (সহীহ বুখারী) আরেক হাদীসে তিনি বলেন: > “যে আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্ন করে, সে জান্নাতে যাবে না।” (সহীহ মুসলিম) --- (৩ ও ৪) এতিম ও গরিবদের সাথে ভালো ব্যবহার: এতিমদের দয়া-মমতা দিয়ে দেখাশোনা করা। গরিবদের সাহায্য করা, খালি হাতে ফেরত না দেওয়া। হাদীস: নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন: > “যে এতিমের দেখাশোনা করে, সে ও আমি জান্নাতে একসাথে থাকবো।” (সহীহ বুখারি) > “যে ব্যক্তি গরিব ও বিধবা নারীদের সাহায্য করে, সে আল্লাহর পথে জিহাদকারীর মতো।” (সহীহ বুখারী) --- (৫) পড়শীর সাথে ভালো ব্যবহার: ঘনিষ্ঠ পড়শী বলতে বুঝায় যার বাড়ি একদম পাশে। দূর পড়শী সেই, যিনি একটু দূরে থাকেন। হাদীস: হযরত জিবরাইল (আঃ) এতবার পড়শীর বিষয়ে ওসিয়ত করতেন যে, নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম ভাবলেন, বুঝি পড়শীকেও উত্তরাধিকারী করে দিবেন। (সহীহ বুখারী) (৬) পাশে বসা লোকদের সাথে ভালো আচরণ: এর মধ্যে পড়ে: স্ত্রী, বন্ধুবান্ধব, ভ্রমণসঙ্গী, মসজিদ বা যেকোনো আসরে পাশের লোক। সবার সাথেই সদাচরণ জরুরি—even যদি মাত্র একবারের জন্য পাশে বসে। --- (৭) অতিথি বা ভ্রমণকারীর প্রতি সদাচরণ: হাদীস: নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন: > “যে ব্যক্তি আল্লাহ ও কিয়ামতের উপর বিশ্বাস রাখে, সে যেন অতিথির আপ্যায়ন করে।” (সহীহ মুসলিম) --- (৮) কর্মচারী / চাকর / অধীনস্থদের সাথে সদ্ব্যবহার: তাদের অতিরিক্ত বোঝা দেওয়া যাবে না। গালি বা খারাপ ভাষা ব্যবহার করা যাবে না। যা নিজে খাও, তা-ই তাদেরও খাওয়াও। যা নিজে পরো, তাদেরও তেমন পরাও। হাদীস: নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম বলেন: > “তোমাদের দাসরা (চাকর-বাকর) তোমাদের ভাই। আল্লাহ তাদের তোমাদের অধীনস্থ করেছেন। তাই যেটা নিজেরা খাও, সেটাই তাদের খাওয়াও। যেটা নিজেরা পরো, সেটাই তাদের পরাও। ওদের ওপর বেশি চাপ দিলে, সাহায্যও করো।” (সহীহ মুসলিম) হাদিসের আলোকে পিতা-মাতার মর্যাদা: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবদ্দশায় পিতা-মাতার মর্যাদা ও তাদের প্রতি কর্তব্য পালনের বিষয়ে উম্মতকে বিশেষভাবে শিক্ষা দিয়েছেন। حَدَّثَنَا أَبُو عَاصِمٍ، عَنْ بَهْزِ بْنِ حَكِيمٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ جَدِّهِ، قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللهِ، مَنْ أَبَرُّ؟ قَالَ: أُمَّكَ، قُلْتُ: مَنْ أَبَرُّ؟ قَالَ: أُمَّكَ، قُلْتُ: مَنْ أَبَرُّ؟ قَالَ: أُمَّكَ، قُلْتُ: مَنْ أَبَرُّ؟ قَالَ: أَبَاكَ، ثُمَّ الأَقْرَبَ فَالأَقْرَبَ. হাকীম ইবনে হিযাম (রাঃ) বলেন, আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! সদ্ব্যবহার পেতে কে অগ্রগণ্য? তিনি বলেনঃ তোমার মা। আমি বললাম, তারপর কে? তিনি বলেনঃ তোমার মা। আমি বললাম, তারপর কে? তিনি বলেনঃ তোমার মা। আমি বললাম, তারপর কে? তিনি বলেনঃ তোমার পিতা, তারপর ক্রমান্বয়ে আত্মীয়ের সম্পর্কের নৈকট্যের ভিত্তিতে (দারিমী, তিরমিযী, হাকিম) أنَّ جاهمةَ جاء إلى النَّبيِّ صلى الله عليه وسلم فقال يا رسولَ اللهِ أردتُ أن أغزوَ وقد جئتُ أستشيرُك فقال هل لك من أمٍّ قال نعم قال فالزَمْها فإنَّ الجنَّةَ عند رِجلِها • أخرجه النسائي (٣١٠٤)، وابن ماجه بعد حديث (٢٧٨١)، وأحمد (١٥٥٣٨) باختلاف يسير জাহিমাহ নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম এর নিকট আসল এবং বলল: হে আল্লাহর রাসূল! আমি জিহাদে যেতে চাচ্ছি এবং আমি আপনার পরামর্শ নিতে এসেছি। তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বললেন: তোমার কি মা আছে? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: তবে তার সঙ্গেই থাকো, নিশ্চয় জান্নাত তার পায়ের নিচে। এই হাদিসটিতে মায়ের মর্যাদা বোঝানো হয়েছে যে জিহাদের চেয়ে মায়ের সেবা করা উত্তম । - من أصبحَ مُطيعًا للَّهِ في والديْهِ أصبحَ لَهُ بابانِ مفتوحانِ منَ الجنَّةِ وإن كانَ واحدًا فواحدًا ومن أمسى عاصيًا للَّهِ في والديْهِ أصبحَ لَهُ بابانِ مفتوحانِ منَ النّارِ وإن كانَ واحدًا فواحدًا قالَ رجلٌ وإن ظَلَماهُ قالَ وإن ظَلَماهُ وإن ظَلماهُ وإن ظَلَماه. উৎস: * বায়হাকী, শু‘আবুল ঈমান (৭৯১৬) * ইবনু ‘আসাকির, তারীখু দিমাশক (৩৩/৩৬৫) — সামান্য ভিন্নতা সহ। যে ব্যক্তি সকালে এই অবস্থায় হয় যে, সে তার পিতা-মাতার বিষয়ে আল্লাহর আনুগত্য করছে — তার জন্য জান্নাতের দুটি দরজা খোলা থাকে। আর যদি একজন (পিতা-মাতা) জীবিত থাকে, তাহলে একটি (দরজা) খোলা থাকে। আর যে ব্যক্তি সন্ধ্যায় এই অবস্থায় হয় যে, সে তার পিতা-মাতার বিষয়ে আল্লাহর অবাধ্যতা করছে — তার জন্য জাহান্নামের দুটি দরজা খোলা থাকে। আর যদি একজন (পিতা-মাতা) হয়, তাহলে একটি (দরজা) খোলা থাকে। একজন লোক বলল: যদি তারা (অর্থাৎ পিতা-মাতা) তার ওপর জুলুমও করে? তিনি (নবী সাল্লাল্লাহু আলায়হি ওয়াসাল্লাম) বললেন: হ্যাঁ, যদি তারা জুলুমও করে, যদি তারা জুলুমও করে, যদি তারা জুলুমও করে। 📌 গুরুত্বপূর্ণ দিক: এই হাদীসটি পিতা-মাতার অধিকার রক্ষার গুরুত্ব ও তা আল্লাহর আনুগত্য বা অবাধ্যতার সঙ্গে কত গভীরভাবে জড়িত, তা স্পষ্টভাবে তুলে ধরে। এমনকি যদি পিতা-মাতা অন্যায় বা জুলুম করেও থাকেন, তবু তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার ও সম্মান বজায় রাখা ইসলামের নির্দেশ। - أنَّ رجلًا قال: يا رسولَ الله، ما حقُّ الوالدَيْن على ولدِهما؟ قال: هما جنَّتُك ونارُك. ইবনে মাজাহ (৩৬৬২) থেকে বর্ণিত। এক ব্যক্তি বলল: হে আল্লাহর রাসূল! পিতা-মাতার সন্তানের উপর কী হক আছে? তিনি বললেন: তারা তোমার জান্নাত এবং তোমার জাহান্নাম। সংক্ষিপ্ত ব্যাখ্যা: অর্থাৎ, যদি তুমি তাদের খুশি রাখো ও তাদের হক আদায় করো, তবে তারা তোমার জান্নাতের পথ। আর যদি তাদের কষ্ট দাও ও তাদের অমান্য করো, তবে তারা তোমার জাহান্নামের কারণ হতে পারে। عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” مَا مِنْ وَلَدٍ بَارٍّ يَنْظُرُ إِلَى وَالِدَتِهِ نَظْرَةَ رَحْمَةٍ إِلَّا كَانَ لَهُ بِكُلِّ نَظْرَةٍ قَالُوا: وَإِنْ نَظَرَ إِلَيْهَا كُلَّ يَوْمٍ مِائَةَ مَرَّةٍ؟ قَالَ: ” نَعَمْ، اللهُ أَكْبَرُ وَأَطْيَبُ “رواه أبو بكر الإسماعيلي في “معجم أسامي الشيوخ ”) – ومن طريقه البيهقي في “شعب الإيمان . হযরত আব্দুল্লাহ বিন আববাস রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু হতে বর্ণিত, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, যে নেক্কার ছেলে নিজ মাতা-পিতার প্রতি রহমত ও আন্তরিকতার দৃষ্টিতে একবার তাকাবে, আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক দৃষ্টির বিনিময়ে তার জন্য একটি মাবরুর হজ্বের (মকবুল হজ্বের) সাওয়াব লিপিবদ্ধ করবেন। সাহাবাগণ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি উক্ত ব্যক্তি দৈনন্দিন একশত বার তাকায়, তাহলে? তিনি উত্তরে বলেন, হ্যাঁ! আল্লাহ তায়ালা সুমহান ও বড় করুণাময়।(বায়হাক্বী: শুয়াবুল ঈমান ১০/২৬৫) আয়ু ও রিযক বৃদ্ধি পায়: عَنْ ثَوْبَانَ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : ” لَا يَزِيدُ فِي الْعُمْرِ إِلَّا الْبِرُّ ، وَلَا يَرُدُّ الْقَدَرَ إِلَّا الدُّعَاءُ ، وَإِنَّ الرَّجُلَ لَيُحْرَمُ الرِّزْقَ بِخَطِيئَةٍ يَعْمَلُهَا হযরত সাওবান রাদিয়াল্লাহু তাআলা আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেন, দোয়া ব্যতিত অন্য কিছুই ভাগ্যকে বদলাতে পারে না এবং পিতামাতার প্রতি সদাচার ব্যতিত অন্য কিছুই আয়ুকে প্রলম্বিত করতে পারে না। কোন ব্যক্তি তার পাপের কারণে তার রিযিক থেকে বঞ্চিত হয়। (ইবনে মাজাহ-৮৭) বর্তমান যুগে মা বাবার সাথে ইসলাম বিরোধী আচার আচরণ করা হয়।যে মা বাবা ছোটতে কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে তাদেরই ঘর ধাক্কা দিয়ে বের করে দিচ্ছে। তাদের আর ঠাই নেই তাদের নিজের ভিটেতে বরং যেতে হয় বৃদ্ধাশ্রমে। হায়রে দুনিয়ার মূর্খ লোক কবে তোদের আসবে ফিরে হোশ। মনে কর সেই দিনের কথা যখন পিঠে করে নিয়ে যেত তোর বাবা। জিজ্ঞেস করে দেখ কত দিন খেতে পাইনি মন ভোরে ভেবে তোদের কথা। খবর নিয়ে দেখ কত দিন বিদেশে আছে কোন হালে। আসবে কি তোর চোখে জল তাঁর দুঃখের কাহিনী শুনে ? উপসংহার: কোরআন ও হাদিস দ্বারা এটাই স্পষ্ট যে, পিতামাতার মর্যাদা হলো একজন সন্তানের জন্য আল্লাহর পরেই সর্বোচ্চ গুরুত্বের বিষয়। তাদের প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও সেবা প্রদর্শন প্রত্যেক মুসলিমের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব, যা ইহকালীন শান্তি ও পরকালীন মুক্তির পথ খুলে দেয়। তাই, পিতামাতার আদেশ-নিষেধ মেনে চলা, তাদের প্রতি বিনয়ী হওয়া এবং তাদের খেদমত করা একজন মুসলিম সন্তানের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য। বিশেষ কিছু কথা : প্রিয় ইসলামি পাঠকবন্ধু, পিতা-মাতা আল্লাহ তাআলার অসংখ্য নেয়ামতের মধ্যে অন্যতম এক অমূল্য নেয়ামত। তারা সর্বদা তাদের সন্তানের মঙ্গল কামনা করেন এবং চান যে তাদের সন্তান সুখে-শান্তিতে জীবন যাপন করুক। তাই আমাদের কর্তব্য হলো পিতা-মাতার সেই মহান স্বপ্নগুলো পূরণ করার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করা, যাতে তারা খুশি হন এবং আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি লাভ করা যায়। কখনো এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যার কারণে পরিবার বা পিতা-মাতার সম্মান ক্ষুণ্ন হয়। কারণ এতে তাদের বহুদিনের স্বপ্ন ভেঙে যায় এবং তারা কষ্ট পান। বরং সবসময় এমন কাজের চেষ্টা করা উচিত, যা তাদের গর্বিত করে তোলে এবং সমাজে মা-বাবার মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। والله عز وجل أعلم بالصواب" />
Comments -