দরূদ পাঠের ফযীলত
দরূদ পাঠের ফযীলত
আশিকুল হক মোজাদ্দেদী
শিক্ষক: কির্ত্তনীয়াপাড়া মদিনাবাগ মাদ্রাসা, মুর্শিদাবাদ
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পাঠ করা বিশেষ একটি ইবাদত। মহান আল্লাহ পাক রব্বুল আলামীন ও তাঁর ফিরিশতাগণ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ প্রেরণ করেন এবং সকল ঈমানদারদেরকে দরুদ পাঠ করার নির্দেশ দেন। উক্ত ইবাদত পালনের মাধ্যমে দরূদ পাঠকারী অনেক সাওয়াবের অধিকারী হয়ে থাকে, যা পবিত্র কোরআন ও সহীহ হাদীসে উল্লেখিত রয়েছে। নিম্নে দরুদের কয়েকটি ফযীলত ও উপকারিতা উল্লেখ করা হলো।
আল্লাহর তায়ালার রহমত অর্জিত হয়:
রাসূললুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেন,
مَنْ صَلّى عَلَيَّ وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرًا ‘
অর্থাৎ ,যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে আল্লাহ তায়ালা তার উপর দশবার রহমত অবতীর্ণ করেন’।( মুসলিম, ৪০৮ নং )
আব্দুর রহমান বিন আওফ রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বাইরে বের হলেন, এবং একটি খেজুরের বাগানে প্রবেশ করলেন এবং সেখানে সাজদা করলেন, তিনি দীর্ঘক্ষণ সাজদায় রইলেন এমনকি আমি ধারণা করলাম, হয়তো আল্লাহ তায়ালা এই সাজদার মধ্যেই তাঁর রূহ কবজ করে নিয়েছেন ? এজন্য আমি কাছে এসে লক্ষ্য করলাম। তিনি মাথা তুলে বললেন, আব্দুর রহমান, তোমার কী হয়েছে? তখন আমি আমার মনের ভয়ের কথা তাঁকে জানালাম। নিশ্চয়ই জিবরাইল আলায়হিস সালাম আমার কাছে এসেছিলেন এবং আমাকে শুসংবাদ দিলেন। তিনি বললেন:
‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন ,
مَنْ صَلَّى عَلَيْكَ صَلَّيْتُ عَلَيْهِ وَمَنْ سَلَّمَ عَلَيْكَ سَلَّمْتُ عَلَيْهِ، ‘
অর্থাৎ, আপনার উপর যে দরূদ পাঠ করবে আমিও তার উপর রহমত অবতীর্ণ করব, আর যে আপনার উপর সালাম পাঠাবে আমি তার উপর শান্তি বর্ষণ করব’। ( মুসনাদে আহমাদ, ১৬৬৪ নং )
ফিরিরশতা কর্তৃক আল্লাহর কাছে রহমতের জন্য দো‘আ :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপরে দরূদ পাঠকারীর জন্য ফিরিশতারা আল্লাহর নিকটে দো‘আ করে থাকেন। হাদীস শরীফে আছে-
عن النبی صلی اللہ علیہ وسلم قال مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُصَلِّي عَلَىَّ إِلاَّ صَلَّتْ عَلَيْهِ الْمَلاَئِكَةُ مَا صَلَّى عَلَىَّ فَلْيُقِلَّ الْعَبْدُ مِنْ ذَلِكَ أَوْ لِيُكْثِرْ
অর্থাৎ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেনঃ যখন কোন মুসলিম ব্যাক্তি আমার প্রতি দুরূদ পাঠ করে এবং যতক্ষণ সে আমার প্রতি দুরূদ পাঠরত থাকে, ততক্ষণ ফেরেশতাগণ তার জন্য দোআ করতে থাকেন। অতএব বান্দা চাইলে তার পরিমাণ (দরূদ পাঠ) কমাতেও পারে বা বাড়াতেও পারে।( ইবনে মাজাহ, ৯০৭ নং )
পাপ মোচন, সাওয়াব ও মর্যাদা লাভ :
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম -এর প্রতি দরূদ পাঠ করা গুনাহ মাফ, সওয়াব ও মর্যাদা লাভের অন্যতম মাধ্যম।
مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلاَةً وَاحِدَةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ عَشْرَ صَلَوَاتٍ وَحُطَّتْ عَنْهُ عَشْرُ خَطِيْئَاتٍ وَرُفِعَتْ لَهُ عَشْرُ دَرَجَاتٍ،
অর্থাৎ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করে, তার বিনিময়ে সেই ব্যক্তির উপর আল্লাহ দশটি রহমত বর্ষণ করেন এবং তার দশটি পাপ মোচন করেন ও তার দশ ধাপ মর্যাদার স্তর উন্নত করেন’।( মিশকাত, ৯২২ নং )
ক্বিয়ামতের দিন মর্যাদা লাভ :
দুনিয়াতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি যে যত বেশী দরূদ পাঠ করবে ক্বিয়ামতের দিন সে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর তত বেশী নিকটবর্তী হবে।
قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ اَوْلَى النَّاسِ بِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ اَكْثَرُهُمْ عَلَىَّ صَلَوةً
অর্থাৎ, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন যারা আমার প্রতি বেশী বেশী দরূদ পাঠ করবে তারা ক্বিয়ামাতের দিন আমার বেশী নিকটবর্তী হবে। ( মিশকাত, ৯২৩ নং )
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর শাফা‘আত লাভ :
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ، أَنَّهُ سَمِعَ النَّبِيَّ صلي الله عليه وسلم يَقُولُ " إِذَا سَمِعْتُمُ الْمُؤَذِّنَ فَقُولُوا مِثْلَ مَا يَقُولُ ثُمَّ صَلُّوا عَلَىَّ فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَىَّ صَلَاةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا ثُمَّ سَلُوا اللهَ عَزَّ وَجَلَّ لِيَ الْوَسِيلَةَ فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ لَا تَنْبَغِي إِلَّا لِعَبْدٍ مِنْ عِبَادِ اللهِ تَعَالَى وَأَرْجُو أَنْ أَكُونَ أَنَا هُوَ فَمَنْ سَأَلَ اللهَ لِيَ الْوَسِيلَةَ حَلَّتْ عَلَيْهِ الشَّفَاعَةُ " .
অর্থাৎ, হয়রত আব্দুল্লাহ বিন’আমর ইবনিল ’আস রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু সূত্রে বর্ণিত। তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছেনঃ তোমরা আযান শুনতে পেলে মুয়াজ্জিন যেরূপ বলে তোমরাও তদ্রুপ বলবে। তারপর আমার উপর দরূদ পাঠ করবে। কেননা কেউ আমার উপর একবার দরূদ পাঠ করলে আল্লাহ তার প্রতি দশবার রহমত বর্ষণ করেন। অতঃপর তোমরা আল্লাহর নিকট আমার জন্য ওয়াসিলাহ প্রার্থনা করবে। ওয়াসিলাহ হচ্ছে জান্নাতের একটি বিশেষ মর্যাদার আসন, যার অধিকারী হবেন আল্লাহর একজন বিশিষ্ট বান্দা। আমি আশা করছি, আমিই হবো সেই বান্দা। কেউ আল্লাহর নিকট আমার জন্য ওয়াসিলাহ্ প্রার্থনা করলে সে আমার শাফা’আত পাবে।( আবু দাউদ, ৫২৩ নং)
জান্নাতে বিশেষ মর্যাদা লাভ :
জান্নাতে উচ্চমর্যাদা লাভের জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর প্রতি দরূদ পাঠ বিশেষ একটি মাধ্যম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,
فَمَنْ كاَنَ أَكْثَرُهُمْ عَلَيَّ صَلَاةً كَانَ أَقْرَبُهُمْ مِنِّي مَنْزِلَةً،
অর্থাৎ যে ব্যক্তি যত বেশী আমার প্রতি দরূদ পাঠ করবে, সে ব্যক্তি (জান্নাতে) মর্যাদায় তত বেশী আমার নিকটবর্তী হবে। ( সুনানুল কুবরা, হাদীস :৫৯৯৫ )
ফেরেশতারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে দরূদ পৌঁছান :
عن ابی ھریرۃ قَالَ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ يَقُوْلُ لَا تَجْعَلُوْا بُيُوْتَكُمْ قُبُوْرًا وَلَا تَجْعَلُوْا قَبْرِىْ عِيْدًا وَّصَلُّوْا عَلَىَّ فَاِنَّ صَلوتَكُمْ تَبْلُغُنِىْ حَيْثُ كُنْتُمْ.
অর্থাৎ, হযরত আবু হুরায়রা রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম কে বলতে শুনেছিঃ তোমরা তোমাদের ঘরকে কবরস্থান বানিও না, আর আমার কবরকেও উৎসবস্থলে পরিণত কর না। আমার প্রতি তোমরা দরূদ পাঠ করবে। তোমাদের দরূদ নিশ্চয়ই আমার কাছে পৌছায়, তোমরা যেখানেই থাক না কেন।( মিশকাত, ৯২৬ নং )
🔸 দরুদ পাঠের মাধ্যমে মনস্কামনা পূর্ণ হয়:
وَعَنْ أُبَيِّ بْنِ كَعْبٍ قَالَ قُلْتُ يَا رَسُولُ اللهِ إِنِّيْ أُكْثِرُ الصَّلَاةَ عَلَيْكَ فَكَمْ أَجْعَلُ لَكَ مِنْ صَلَاتِيْ فَقَالَ مَا شِئْتَ قُلْتُ الرُّبُعَ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكَ قُلْتُ النِّصْفَ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَكَ قَالَ قُلْتُ فَالثُّلُثَيْنِ قَالَ مَا شِئْتَ فَإِنْ زِدْتَ فَهُوَ خَيْرٌ لَّكَ قُلْتُ أَجْعَلُ لَكَ صَلَاتِيْ كُـلَّهَا قَالَ إِذًا تُكْفـى هَمَّكَ وَيُكَفِّرُ لَكَ ذَنْبُك
অর্থাৎ, হযরত উবাই ইবনে কা’ব রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর কাছে গিয়ে আরয করলাম, হে আল্লাহর রসূল! আমি আপনার উপর অনেক বেশী দরূদ পাঠ করি। আপনি আমাকে বলে দিন আমি (যিকর ও আযকারের জন্য যতটুকু সময় বরাদ্দ করে রেখেছি তার) কতটুকু সময় আপনার উপর দরূদ পাঠ করার জন্য নির্দিষ্ট করব? উত্তরে নাবী সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়। আমি আরয করলাম, যদি এক তৃতীয়াংশ করি? নাবী সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, তোমার মন যা চায়, যদি আরো বেশী কর তাহলে তা তোমার জন্য কল্যাণকর। আমি আরয করলাম, যদি অর্ধেক সময় নির্ধারণ করি? নাবী সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, তোমার মন যতটুকু চায় কর। যদি আরো বেশী নির্ধারণ কর তাহলে তোমার জন্যই ভাল। আমি বললাম, যদি দুই-তৃতীয়াংশ করি। নাবী (সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, তোমার মন যা চায়। যদি আরো বেশি নির্ধারণ কর তোমার জন্যই কল্যাণকর। আমি আরয করলাম, তাহলে আমি আমার সবটুকু সময়ই আপনার উপর দরূদ পড়ার কাজে নির্দিষ্ট করে দেব। নাবী সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম
🔸দো‘আ কবুল হয় :
وَعَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ كُنْتُ أُصَلِّي وَالنَّبِيُّ ﷺ وَأَبُو بَكْرٍ وَّعُمَرُ مَعَه فَلَمَّا جَلَسْتُ بَدَأْتُ بِالثَّنَاءِ عَلَى اللهِ تعالى ثُمَّ الصَّلَاةِ عَلَى النَّبِيِّ ﷺ ثُمَّ دَعَوْتُ لِنَفْسِي فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ سَلْ تُعْطَهْ سَلْ تُعْطَهْ
অর্থাৎ, হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নামায আদায় করছিলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম উপস্থিত ছিলেন, তাঁর কাছে আবূ বাকর ও উমার রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুমা উপস্থিত ছিলেন। সলাত শেষে আমি যখন বসলাম আল্লাহ তা’আলার প্রশংসা করলাম, এরপর রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপর দরূদ পাঠ করলাম। তারপর আমি আমার নিজের জন্য দোআ করতে লাগলাম। নাবী সাল্লাল্লাহু, আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, চাও, তোমাকে দেওয়া হবে। চাও, তোমাকে দেওয়া হবে।( মিশকাত, ৯৩১ নং )
🔸বিপদগ্রস্ত ও আশাহত হওয়া থেকে রক্ষা :
عَنِ النَّبِيِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ " مَا جَلَسَ قَوْمٌ مَجْلِسًا لَمْ يَذْكُرُوا اللَّهَ فِيهِ وَلَمْ يُصَلُّوا عَلَى نَبِيِّهِمْ إِلاَّ كَانَ عَلَيْهِمْ تِرَةً فَإِنْ شَاءَ عَذَّبَهُمْ وَإِنْ شَاءَ غَفَرَ لَهُمْ
অর্থাৎ, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেনঃ কোন সম্প্রদায় যখন কোন মজলিসে উপস্থিত হয় কিন্তু সেখানে তারা যদি আল্লাহর যিকর না করে এবং তাদের নবীর উপর দুরুদ পাঠ না করে, তবে তা তাদের জন্য ক্ষতির কারণ হবে। আল্লাহ্ তায়ালা চাইলে তাদের শস্তি দিবেন আর ইচ্ছা করলে তাদের ক্ষমা করে দিবেন। ( তিরমিযী, ৩৩৮০ নং )
উপরে উল্লেখিত ফজিলত ও উপকারিতা সমূহ ছাড়াও আরো অসংখ্য ফজিলত হাদীস শরীফের মধ্যে বিদ্যমান। অতএব রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি দরুদ পাঠ করা ভ্রান্ত কোন বিষয় নয় বরং ইবাদতেরই একটি বিশেষ অংশ। তাই ভ্রান্ত মতবাদ পোষণকারীদের কথায় কর্ণপাত না করে বেশি বেশি করে দরুদ শরীফ পাঠ করুন এবং অশেষ সাওয়াবের অধিকারী হন।
Comments -