পেশানি তথা কপালে কালো দাগের রহস্য কি? এবং কোরআনে উল্লেখিত “ সিমা শব্দের অর্থ কি হবে?
পেশানি তথা কপালে কালো দাগের রহস্য কি? এবং কোরআনে উল্লেখিত “ সিমা শব্দের অর্থ কি হবে?
মুফতি শামসুদ্দোহা মিসবাহী ( শিক্ষক মাদ্রাসা দারুল উলুম নাসিরুদ্দিন আওলিয়া, পোনকামরা, ফলতা, দঃ২৪পরগনা, পঃবঃ) সহ সভাপতি আল মিসবাহ পত্রিকা
কপালে কালো দাগ সম্পর্কে আলা হযরত ইমাম আহলে সুন্নাতের লিখিত পুস্তক ‘’ ফাতাওয়া আফ্রিকা’’ থেকে একটি বিস্তারিত ফাতাওয়ার মূল সারাংশ নিম্নে উপস্থাপন করা হলো।
প্রশ্ন: কিছু নামাজিদের অতিরিক্ত নামাজ ও বারংবার সাজদা করার কারণে তাদের কপাল ও নাকে যে কালো দাগ হয়ে যায় তার জন্য কবর ও হাশরে তারা আল্লাহর নিকট হইতে কোনরকম রহমত পাবে কি না এবং যায়েদ নামক ব্যাক্তির উক্তি হচ্ছে এই যে যার অন্তরে বুগজ তথা হিংসার কালো দাগ থাকে সে দাগের কারণেই তার কপাল ও নাকের কালো দাগ পড়ে যায় যায়েদ নামক ব্যাক্তির এই উক্তি ঠিক না ভুল?
উওর:- আল্লাহ তাআলা সাহাবায়ে কেরাম ও রসূলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর প্রশংসায় এরশাদ করেন سيماهم في وجوههم من اثر’’ السجود ‘’ অর্থাৎ তাদের চিহ্ন তাদের চেহারায় রয়েছে সাজদার চিহ্ন । ( সুরা ফাতাহ, আয়াত ২৯ ,কানযুল ঈমান)
সাহাবায়ে কেরাম ও তাবেঈন থেকে এই চিহ্নের তাফসীরে চারটি বর্ণনা রয়েছে
প্রথমতঃ ঐ চিহ্নটি হচ্ছে নুর যা কেয়ামতের দিবসে তাদের চেহারায় সাজদার বরকতে হবে এই বর্ণনাটি হযরত আব্দুল্লাহ বিন মাসুদ ইমাম হাসান ও আতিয়াহ আওনি ও খালিদ হানাফী এবং মুকাতিল বিন হায়ান থেকে বর্নিত।
দ্বিতীয়তঃ খুশু’ ও খুদ্বু’ ও আমালে সলেহা তথা ভালো কাজের বরকত ও নিশানি নেক বান্দাদের চেহরায় বিনা কোন সাজসজ্জায় নিজে থেকেই ফুটে ওঠে। এই মত টি হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস ও ইমাম মুজাহিদ থেকে বর্ণিত।
তৃতীয়তঃ চেহেরার যরদী তথা হলুদ বর্ণ যা ক্বিয়ামুল লাইল অর্থাৎ রাত্রি জাগরণ করে ইবাদত করা ক্ষেত্রে হয় এই মত ইমাম হাসান বসরী, দ্বাহাক, ইকরামা ও শামার বিন আতিয় থেকে বর্ণিত।
চতুর্থতঃ এটা ওজুর পর লেগে থাকা পানি ও ধুলোর চিহ্ন যা সাজদা করার সময় নাক ও কপালে লেগে থাকে এই মত ইমাম সাঈদ ও ইকরামা থেকে বর্নিত।
উক্ত বর্ণিত মতের মধ্যে প্রথম দুটি মত শক্তিশালী ও অগ্ৰাধিকারপ্রাপ্ত কারণ দুটি মত স্বয়ং রসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাদিস থেকে বর্ণিত এবং উক্ত মতের মধ্যে সবথেকে বেশি শক্তিশালী ও অগ্রাধিকার প্রাপ্ত মত হচ্ছে প্রথম মতটি কারণ রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু তা'আলা আলাইহি ওয়াসাল্লামের দ্বারা হাসান সূত্রে বর্ণিত ও প্রমানিত
رواه الطبراني في معجميه المتوسط و الصغير و ابن مردويه عن ابي كعب رضى الله عنه قال قال رسول الله صلى الله تعالى عليه وسلم في قوله عذاب جلا سيماهم في وجوههم من اثر السجود وقال النور يوم القيامه
এজন্যই ইমাম জালালুদ্দিন মহাল্লি আপন পুস্তক তাফসীরে জালালাইনে এই মতের উপরেই সীমাবদ্ধ থেকেছেন ।
হুজুর আলা হযরতের মত:-
তিনি বলেন তৃতীয় মতে কিছু দুর্বলতা আছে ওটি রাত্রি জাগরন করার চিহ্ন বা দাগ সাজদার চিহ্ন বা দাগ নয়, তবে হ্যাঁ রাত্রি জাগরণ করা সাজদা করার জন্যই হয়। এবং চতুর্থ মত সবথেকে বেশি দুর্বল কেননা চেহারায় অযুর অবশিষ্ট পানি ধুলোযুক্ত চিহ্ন ,দাগ বা ধাব্বা সাজদার কারণে বা তার চিহ্ন নয় বরং নামাজের পরে ধুলো মাটি ঝেড়ে ফেলার হুকুম দেওয়া হয়েছে। কোরআনের আয়াতে যে সীমা শব্দ এসেছে যদি এটা তা হত তাহলে এটাকে ঝেড়ে ফেলার আদেশ দেয়া হতো না। সাঈদ বিন জাবির থেকে এর প্রমাণ না ও থাকতে পারে।
সারাংশ এই যে কালো দাগ যেটি কিছু মানুষের কপালে বা পেশানিতে অতিরিক্ত সাজদার কারণে দেখা যায় বর্ণিত তাফসীরের আলোকে তার কোন নির্দিষ্ট মান নাই কিন্তু হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস ও সাইদ বিন ইয়াজিদ এবং মুজাহিদ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুম থেকে সে সম্পর্কে বর্নিত অমান্য ও ইনকার ইমামে তবারানি মোজামুল কাবীরে, ইমামে বায়হাক্বী তাঁর সুনানে হামিদ বিন আব্দুর রহমান থেকে বর্ণনা করছেন।
সাইব বিন ইয়াজিদ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমার নিকট উপস্থিত ছিলেন। এমত অবস্থায় এক ব্যক্তি এলেন যার চেহারা তথা পেশানির উপরে সিজদার কালো দাগ বা চিহ্ন ছিল। সাইব বিন ইয়াজিদ রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা বললেন
“ لقدافسد وجهه انا والله ما هي السيما التي سمي الله و لقد صليت على جبهتي منذ ثمانين سنه ما اثر السجود بيني وعيني
অর্থাৎ নিশ্চয়ই ওই ব্যক্তি নিজের চেহারা খারাপ করে নিয়েছে শোনো খোদার কসম এটা ওই নিশানি বা চিহ্ন নয় যার কথা কোরআনে এসেছে। আমি আশি বছর ধরে নামাজ পড়ছি আমার মাথায় তথা পেশানিতে দাগ হয়নি।
সাঈদ বিন মনসুর,আবদ বিন হামিদ, ইবনে তাসারুদ ও ইবনে জারীর মুজাহিদ থেকে রেওয়ায়াত বর্ণনা করেছেন (এটা শেষ পেক্ষাপট)
حدثنا ابن حميد ثنا جريرعن منصور عن مجاهد في قوله تعالى سيماهم من اثار السجود قال هو الخشوع فقلت هو اثر السجود فقال انه يكون بين عينيه مثل ركبة العنز وهو كما شاء الله
অর্থাৎ মনসুর বিন মু’তামাদ বলেন ইমামে মুজাহিদ বলেছেন এই চিহ্ন বা দাগ থেকে খুশু’ কথা মনোযোগিতা ও একাগ্রতা বোঝানো হয়েছে আমি বললাম বরং ওটা দাগ বা ছিন্ন যা সাজদার কারণে হয়। তিনি বললেন একজনের মাথায় তথা পেশানিতে এত বড় দাগ হয় যা ছাগলের হাঁটুর সমান এবং বাতিনে তেমনি যেমন আল্লাহ চেয়েছেন অর্থাৎ এই দাগ বা ধাব্বা মুনাফিক ও লাগাতে পারে।
ইবনে জারির হযরত মুজাহিদ দ্বারা হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা থেকে রেওয়ায়াত বর্ণনা করেন ।
اما انه ليس بالذي ترون ولكنه سيما الاسلام ومحبته وسمته خشوعته
অর্থাৎ খবরদার! এটা ওই নিশানি বা চিহ্ন নয়, সেটা তোমরা মনে করো। বরং এটি ইসলামের নূর তার বৈশিষ্ট্যতা তার পন্থা ও তার মনোযোগিতা ও
একাগ্রতা। এছাড়া তাফসিরের খতিব শারবিনি এবং ফুতুহাতে সুলাইমানিয়া তে আছে :-
قال البقاعي ولا يظن ان من السيما ما يصنعه بعض المرائين من اثر هيأة سجود في جبهته فان ذالك من سيما الخوارج وعن ابن عباس عن النبي صلى الله تعالى عليه وسلم انه قال لابغض الرجل واكرهه اذا رايت بين عينيه اثر السجود
অর্থাৎ এই নিশানী তথা চিহ্ন বা দাগ যা কিছু রিয়াকার নিজের মাথায় বানিয়ে নেয় এ ওই নেশানী নয় বরং এটা খারিজিদের নেশানি। এবং ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুমা থেকে মারফু সূত্রে বর্ণিত যে আমি তখন কোন মানুষকে দুশমন ও অপছন্দ করি তখন তার মাথার উপরে সাজদার দাগ বা চিহ্ন দেখি।
আলা হযরত বলেন:- এ রেওয়ায়াতের হাল আল্লাহ জানেন এবং প্রমাণিত মেনে নেওয়ার ক্ষেত্রে যাহারা দেখানোর জন্য মাথা এবং নাক থেকে ধুলো মাটি ঝাড়ে না যাতে মানুষ তাদের নামাজি সাজদা কারী বলে জানে এবং ইনকার ও অমান্য ও সব এক্ষেত্রে রিয়া কারীর দিকেই গণ্য করা হবে। এমনিও বেশি সাজদা করা অবশ্যই পছন্দনীয় এবং পেশানি তথা কপালে তার কারণে নিজ থেকেই দাগ তৈরি হওয়া এবং সেই দাগকে রোকা তার ক্ষমতার বাইরে না সেটা সে মিটাতে পারবে নাহি সেই দাগের ক্ষেত্রে তার কোন খারাপ নিয়েছিল তো এক্ষেত্রে এর উপর ইনকার অমান্যতা এবং তাদের কটুক্ত করা অসম্ভব। বরং ওটা আল্লাহর পক্ষ থেকে তার সৎ আমলের নিশান স্বরূপ চেহারায় ফুটে উঠেছে সুতরাং উক্ত দাগ বা চিহ্ন এক্ষেত্রে কোরআনের আয়াতের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।
এবং বহু তাফসীরকারক এই মতের উপরে নিজেদের মতামত পেশ করেছেন, এবং এরুপ চিহ্ন বা দাগ যা সৎ আমলের বরকতে চেহারায় ফুটে ওঠে হযরত ইমাম জয়নুল আবেদীন রাযিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর চেহারাতেও ছিল।
এই সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনার পর আলা হযরত রাহমাতুল্লাহ আলাইহি প্রশ্নের উত্তরে যায়েদ নামক ব্যাক্তির মত ও উক্তি একেবারেই বাতিল করে এরুপ নিজের মত প্রকাশ করেছেন যে রিয়া কারী তথা লোক দেখানোর জন্য ইচ্ছাকৃত এরকম দাগ ও নিশানি তৈরি করা কঠোর হারাম ও গুনাহে কাবিরা। যদি এই দাগ ও নিশানি অতিরিক্ত সাজদার কারণে নিজ থেকেই পড়ে যায় এবং সাজদা যদি লোক দেখানো হয় তাহলে সাজদাকারী জাহান্নামী এবং এই নিশান ও দাগ যদিও বা কোনো গুনাহের নয় কিন্তু গুনাহের কারণেই তৈরি সুতরাং এটিকে জাহান্নামের নেশানি বলা যাবে। এবং যদি ওই সাজদা শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে হয়ে থাকে এবং এই দাগ পড়ার পর মনে মনে খুশি হয় যে মানুষজন আমাকে এবাদতকারী ও সাজদা কারী মনে করবে তাহলে এটি রিয়ার অন্তর্ভুক্ত এবং এই দাগ তার জন্য অভিশপ্ত। এবং যদি ওই দাগের উপরে তার কোন রকমের প্রতিক্রিয়া না থাকে তাহলে এই নিশানি ও দাগ তার জন্য ভালো ও পছন্দনীয়। এবং এক দলের নিকট আয়াতে কারিমাতে তার প্রশংসা করা হয়েছে, আশা রাখা যায় যে কবরে তার ঈমান ও নামাজের নিশানি হতে পারে আর কেয়ামতের দিবসে এই নিশানি সূর্যের থেকে বেশি আলোকিত হতে পারে যদি তার আকিদা আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত অনুযায়ী সঠিক ও হক্কানি হয়। পক্ষান্তরে বদদ্বীন ও গুমরাহর কোন ইবাদতই দেখা হয়না। যেমনটি ইবনে মাযাহ ইত্যাদি হাদিসের মধ্যে রাসূলুল্লাহ স্বাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণিত রয়েছে যে এটাই ওই দাগ বা ধাব্বা যা খারিজিদের আলামত বা নিশানি বলা হয়েছে।
এক কথায় গুমরাহ বদমাযহাবের দাগ বা ধাব্বা অপছন্দনীয় এবং সুন্নিদের দাগ বা নিশানির মধ্যে দুইটির সম্ভাবনা রয়েছে যদি লোক দেখানো হয় তবে অপছন্দনীয় অন্যথায় পছন্দনীয়।
Comments -