হাদীসটি “সহীহ নয়” বলতে কী বোঝায়?
হাদীসটি “সহীহ নয়” বলতে কী বোঝায়?
✍️ মাওলানা হাশিমুদ্দিন মিসবাহী, বীরভূম
রি-চেকার: মাসিক আল-মিসবাহ
গায়ের মুকাল্লিদ এবং পথভ্রষ্ট মতাদর্শে বিশ্বাসী এক শ্রেণির উদ্দেশ্যপ্রণোদিত চক্র সাধারণ মুসলমানদের মধ্যে এই বিভ্রান্তিকর মিথ্যাচার প্রচার করতে সচেষ্ট যে, মুহাদ্দিসগণ যখন বলেন “لا يَصِحُّ هذا الحديث” অর্থাৎ, এই হাদীসটি সহীহ নয়, তখন তাদের বক্তব্যের তাৎপর্য এই যে উক্ত হাদীসটি মওজু (জাল), মনগড়া কিংবা সম্পূর্ণ মিথ্যা। অথচ হাদীস বিশেষজ্ঞদের দৃষ্টিকোণ থেকে এই ব্যাখ্যা সম্পূর্ণ ভুল এবং ভিত্তিহীন।
হাদীসশাস্ত্রে বর্ণিত হাদীসের বিভিন্ন স্তর রয়েছে। এর মধ্যে সর্বোচ্চ স্তর হল “সহীহ” হাদীস। এই বিষয়ে বিশদ আলোচনা নিম্নে উপস্থাপন করা হলোঃ
হাদিস তিন প্রকার যথা_
১) সহীহ ২) হাসান ৩) যঈফ
সহীহ হাদীসের সংজ্ঞা
আল্লামা আলী ইবনে মুহাম্মদ জুরযানী রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু: ৮১৬ হিজরী) ‘সহীহ’ হাদীস সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন: هو ما اتصل سنده بنقل العدل الضابط عن مثله وسلم عن شذوذ وعلة
অনুবাদ: সহীহ হাদীস সেই হাদীস, যার সনদ নিরবচ্ছিন্নভাবে সংযুক্ত, যার প্রত্যেক রাবি চরিত্রে ন্যায়বান এবং স্মরণে দৃঢ়, এবং যে হাদীস মুক্ত শুযূজ (বিরল, বিরোধী রেওয়ায়াত) ও ইল্লাত (অন্তর্নিহিত গোপন ত্রুটি) থেকে। (আল মুখতাসার ফি উসুলিল হাদিস, পৃষ্ঠা -৬৮)
উপরোক্ত সংজ্ঞা কর্তৃক স্পষ্ট হল যে, হাদীস সহীহ হওয়ার জন্য পাঁচটি শর্ত কিংবা গুণ থাকা অনিবার্যঃ
১. عدالت روات তথা বর্ণনাকারীদের ন্যায়পরায়ণ হওয়া।
২. تَامُ الضَّبْطِ তথা বর্ণনাকারীদের পূর্ণ আয়ত্তশক্তিসম্পন্ন হওয়া।
৩. مُتَّصِلُ السَّنَدِ তথা সূত্রের ধারাবাহিকতা অবিচ্ছিন্ন হওয়া।
৪. عَدَمٌ عِلَّتْ তথা সনদে কোনো ইল্লত বা দোষ-ত্রুটি না থাকা।
৫. عَدَمٌ شَاذْ তথা সনদটি شَاذْ অর্থাৎ একাকী বা নিঃসঙ্গ না হওয়া। (নুযহাতুন নাযার/ তাইসিরু মুসতালাহাতিল হাদিস)
⚫এই পাঁচটি শর্তের যেকোনো একটি না থাকলে, হাদীসটিকে ‘সহীহ’ বলা হবে না। তবে, এটি তখন সহীহ লিগাইরিহী, হাসান, অথবা যঈফ বলে গণ্য হবে। কিন্তু শুধুমাত্র ‘সহীহ নয়’ বলার অর্থ এই নয় যে, এটি মওজু, জাল অথবা ভিত্তিহীন।
উপরোক্ত আলোচনার ভিত্তিতে যে মূলনীতি উপস্থাপন করা হলো সেগুলোকে বর্তমানে কিছু তথাকথিত “আহলে হাদীস” শ্রেণির লোক, হাদীস শাস্ত্রের সুপ্রতিষ্ঠিত মূলনীতি ও পরিভাষাগত স্তরবিন্যাসকে সম্পূর্ণরূপে উপেক্ষা করে, মনগড়া ব্যাখ্যার আশ্রয় নিয়ে বিভ্রান্তিকর অপপ্রচার চালাচ্ছে। তারা এমন হাদীসসমূহ, যেগুলো সম্পর্কে কোনো মুহাদ্দিস "এই হাদীসটি সহীহ নয়" মর্মে মন্তব্য করেছেন, তা থেকে ভ্রান্ত উপসংহার টেনে হাদীসটিকে সম্পূর্ণরূপে বর্জনযোগ্য বলে চালাতে চায় এবং কখনো কখনো জাল বলার দুঃসাহসও দেখায়।
অথচ হাদীস শাস্ত্রের নিরিখে এই দৃষ্টিভঙ্গি সম্পূর্ণ পরিভাষাগত অজ্ঞতার পরিচায়ক। কারণ, কোনো হাদীস যদি সহীহ না হয়, তবে তা হাসান, অথবা যঈফ পর্যায়েরও হতে পারে। একে সঙ্গে সঙ্গে মাওজু (জাল) অথবা ভিত্তিহীন সাব্যস্ত করার কোনো বস্তুনিষ্ঠ ভিত্তি নেই।
অতএব কোনো হাদীসের ব্যাপারে শুধুমাত্র "সহীহ নয়" বলা হয়েছে, এই কথাকে পুঁজি করে তাকে মিথ্যা,মওজু অথবা ভিত্তিহীন বলে সাব্যস্ত করা হাদীস শাস্ত্রের ও হাদীসের মূলনীতির উপর মিথ্যাচার।
উল্লিখিত নীতিমালাগুলোর নির্ভরযোগ্যতা প্রমাণের লক্ষ্যে, আমি ইন শা আল্লাহ্ একাধিক স্বীকৃত ও প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিসগণের মতামত ও ব্যাখ্যা সূত্রসহ উপস্থাপন করব।
ইমামগণের মতামত উদ্ধৃত করার পূর্বে বিষয়টির সুস্পষ্টতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ উপস্থাপন করা উপযুক্ত হবে, যার মাধ্যমে আলোচ্য বিষয়ের প্রকৃতি ও পরিপ্রেক্ষিত আরও স্পষ্টভাবে প্রতিভাত হবেঃ
মুহাদ্দিসগণ কোনো হাদিস সম্পর্কে জারহ (সমালোচনা) বা কোনো নির্দিষ্ট বিধান প্রদান করলে, তা অনেক সময় কেবল সেই নির্দিষ্ট সূত্রের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য হয়, যার উপর সমালোচনা করা হয়েছে। আবার বহু ক্ষেত্রে দেখা যায়, একটি হাদিসের কোনো একটি সূত্রের ভিত্তিতে তাকে দুর্বল, এমনকি জাল বলেও অভিহিত করা হয়, অথচ অন্য সূত্রে সেটি প্রমাণিত হয়ে থাকে।
উদাহরণস্বরূপঃ মীযানুল ই’তিদাল গ্রন্থে উল্লেখ রয়েছে যে, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি হাদিস "طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ" (প্রত্যেক মুসলিমের ওপর জ্ঞান অর্জন করা ফরজ) সম্পর্কে মন্তব্য করেছিলেন যে, এটি মওজু,জাল ও ভিত্তিহীন। তবে আল্লামা যাহাবী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি স্পষ্ট করেছেন যে, ইমাম আহমাদের এই মন্তব্য কেবল সেই সূত্রের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, যাতে ইব্রাহিম ইবনে মূসা আল-মারওয়াজি রয়েছেন। অন্য সূত্রে এই হাদিসটি প্রমাণিত হয়েছে। এমনকি সুনানে ইবনে মাযাহ গ্রন্থেও এ হাদিসটি বর্ণিত রয়েছে। যদিও পরবর্তীকালে বহু হাদিস বিশেষজ্ঞ সেই সনদগুলোকেও দুর্বল বলেছেন, তবে হাদিসের শব্দসমূহকে তিনারা গ্রহণযোগ্য তথা সহীহ বলে স্বীকৃতি প্রদান করেছেন।
আল্লামা ইমাম ইবনে হাজার মাক্কী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি তদীয় প্রসিদ্ধ গ্রন্থ আস্-সাওয়ায়েকুল মুহরিকা-তে বলেছেন:
قَوْلُ أَحْمَدَ إِنَّهُ لَا يَصِحُّ أَى لِذَاتِهِ فَلَا يَنْفِئ كَوْنَهُ حَسَنًا لِغَيْرِهِ وَ الْحَسَنُ لِغَيْرِهِ يُحْتَجَّ بِهِ كَمَا بُيِّنَ فِي عِلْمِ الْحَدِيثِ
অর্থাৎ ইমাম আহমাদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি এর উক্তি “এই হাদীস সহীহ নয়”- এর অর্থ হলো, এটি সহীহ লিযাতিহি (নিজ বৈশিষ্ট্যে সহীহ) নয়। তবে এটি দ্বারা এই অর্থ নির্গত হয় না যে, হাদীসটি হাসান লিগাইরিহি (অন্য বর্ণনার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়ে উঠা হাসান) হওয়া থেকেও বঞ্চিত। আর হাদীস হাসান, যদিও তা লিগাইরিহি হয়, তাও শরিয়তের দৃষ্টিতে দলিল হিসেবে মান্যতা পাবে। যেমনটি ইলমে হাদীসের আলোচনায় বর্ণিত হয়েছে।
ইমাম ইবনে হাজার আসকালানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি‘মুসনাদুল হুফ্ফায’ গ্রন্থে, ইমাম নববী রহমাতুল্লাহি আলাইহি এর প্রণীত 'আল-আযকার' গ্রন্থে বর্ণিত হাদীসসমূহের তাখরীজ বা উৎস নির্ণয়ের প্রসঙ্গে বলেনঃ
مَنْ نَفِی الصِّحَّةَ لَا يَنْفِي الْحُسْنَ
অনুবাদ:- কোনো হাদীসের সহীহ হওয়াকে অস্বীকার করলে, হাসান হাদিস অস্বীকারের আবশ্যকতা আসে না।
উপরোক্ত ভূমিকা ও প্রাসঙ্গিক আলোচনার পরবর্তী পর্যায়ে, প্রবন্ধটি অতিরিক্ত দীর্ঘ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় সংক্ষিপ্তভাবে ইমামগণ ও মুহাদ্দিসগণের কিছু নির্বাচিত অভিমত উপস্থাপন করা হলো।
অভিমত:-১
ইমাম ইবনু হাজার আসকালানী রাহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৮৫২ হিজরী) তিনি বলেন:
ইমাম বুখারী রহমাতুল্লাহি আলাইহি একটি হাদীস সম্পর্কে মন্তব্য করেন:
وَقَالَ لَمْ يَصِحِ انْتَهَى وَلَا يَلْزَمُ مِنْ كَوْنِ الْحَدِيثِ لَمْ يَصِحُ أَنْ يَكُونَ مَوْضُوعًا
অনুবাদ:- এই হাদীসটি সহীহ নয়,তবে কোনো হাদীস সহীহ না হওয়া থেকেই একথা প্রমাণিত হয় না যে তা জাল বা বানোয়াট।
📚 তথ্যসূত্র: মূল গ্রন্থ: আল কাওলুল মুসাদ্দাদ ফিয্যাব আন মুসনাদে আহমদ পৃষ্ঠা: ৩৪
প্রকাশনী: ইবনু তাইমিয়্যাহ লাইব্রেরি, কায়রো, মিসর।
অভিমত:-২
আল্লামা আবুল হাসনাত আবদুল হাই লখনভী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেছেন:
کثیرا مَا يَقُولُونَ لَا يَصحو لايثبت هَذَا الحَدِيث ويظن مِنْهُ من لا علم له انه موضوع أَوْ ضَعِيفَ وَهُوَ مَبْنِي على جهلة بمصطلحاتهم وعدم وقوفه على مصرحاتهم
অনুবাদঃ অনেক সময় মুহাদ্দিসগণ কোনো হাদীস সম্পর্কে বলেন: “এই হাদীস সহীহ নয়” অথবা “এই হাদীস প্রমাণিত নয়।” তখন যিনি হাদীস শাস্ত্রের নিয়ম-কানুন সম্পর্কে জানেন না এবং হাদীসবিশারদদের পরিভাষা ও বক্তব্য সম্পর্কে অজ্ঞ, তিনি ধারণা করে বসেন যে এই হাদীসটি হয়তো জাল অথবা দুর্বল।
📚 তথ্যসূত্র: আর রাফউ ওয়াত তাকমীল ফিল-জারহি ওয়াত-তাদীল, পৃষ্ঠা: ১৯১, প্রকাশক: দারুল বাশায়ির আল-ইসলামিয়্যাহ)
অভিমত:-৩
ইমাম ইবনে হাজার মাক্কী তদীয় পুস্তক “আস সাওয়ায়িকুল মুহরিকা” তে লিপিবদ্ধ করেছেন:
قول احمد " انه حديث لا يصح اى لذاته فلا ينفى كونه حسنا لغيره، والحسن لغيره يحتج به كما بين في علم الحديث۔
অনুবাদ:- বাংলা অনুবাদ: ইমাম আহমদ রাহমাতুল্লাহি আলাইহি-এর এই কথা যে ‘এই হাদীসটি সহীহ নয়’। এর অর্থ এই নয় যে, তা ‘সহীহ লিযাতিহি’ (স্বতন্ত্রভাবে সহীহ) নয়; বরং এ বক্তব্য দ্বারা ‘হাসান লিগাইরিহি’ (অন্য সূত্র দ্বারা সহনীয়) হওয়ার অস্বীকৃতি বোঝানো হয়নি। আর ‘হাসান’ হাদীস যদি তা ‘লিগাইরিহি’ হয়, তবুও তা দলিলরূপে গ্রহণযোগ্য। যেমনটি ইলমুল হাদীসের আলোচনায় বিবৃত হয়েছে।
📚 তথ্যসূত্র: আস সাওয়ায়িকুল মুহরিকা গ্রন্থের প্রথম অধ্যায়, পৃষ্ঠা ১৮৫, মাকতাবা মজিদিয়া মুলতান প্রকাশিত)
অভিমত:-৪
বিশ্ববিখ্যাত মুহাদ্দিস আল্লামা ইবনে হাজার আসকালানী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি লিখেছেন:
ان لفظ لا يثبت لا يلزم منه ان يكون موضوعات فإن الثابت يشمل الصحيح فقط والضعيف دونه كذا فى تذكرة الموضوعات المبحث الثاني في اقسام الواضعين
অনুবাদ:- কোনো হাদীস সম্পর্কে যদি মুহাদ্দিসগণ বলেন যে, “এই হাদীসটি মজবুত নয়” বা “সুদৃঢ় নয়”, তাহলে সেটিকে সরাসরি মওজু (বানোয়াট) বা জাল হাদীস বলে গণ্য করা যায় না। কারণ,‘প্রমাণিত’ শব্দটি মূলত সহীহ হাদীসের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। অথচ সহীহ হাদীসের নিচে আরও কিছু স্তর রয়েছে, যেমন- হাসান ও যঈফ।
📚 তথ্যসূত্র: তাজকিরাতুল মওদ্বুআত, পৃষ্ঠা-৭৫
অভিমত:-৫
আল্লামা মুল্লা আলী কারী হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
لا يَصِحُ لَا يُنَافِي الضَّعَفَ وَالْحُسْنَ
অনুবাদ:- এই হাদীসটি সহীহ নয়’ এই কথাটি দুর্বলতা (ضعف) বা গ্রহণযোগ্যতা (হাসান) এর বিপরীত নয়।
অর্থাৎ কোনো হাদীসকে 'সহীহ নয়' বলা মানে এটি দুর্বল বা হাসান হওয়ার সম্ভাবনাকে নাকচ করে না।
📚 তথ্যসূত্র: আল-আসরারুল মারফূআ ফিল-আখবারিল মাওজূআ, পৃষ্ঠা ৩৪৯,মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত।
অভিমত:- ৬
ইমাম যারকশী রহমাতুল্লাহি আলাইহি (মৃত্যু: ৭৯৪ হিজরী) বলেন:
بَيْنَ قَوْلِنَا لَمْ يَصِحٌ وَقَوْلِنَا مَوْضُوعُ بَوْنٌ وَاضِحٌ فَإِنَّ الْوَضْعَ إثْبَات الْكَذِبِ وَقَوْلُنَا لَمْ يَصِحْ إِنَّمَا هُوَ إِخْبَارٌ عَنْ عَدَمٍ الثبوتِ وَلا يَلْزَمُ مِنْهُ إِثْبَاتُ الْعَدَمِ-
অনুবাদ:- আমার ‘এই হাদীসটি সহীহ নয়’ বলার মধ্যে ও ‘এই হাদীসটি জাল (موضوع)’ বলার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। কারণ ‘জাল’ (موضوع) বলার অর্থ হলো হাদীসটিতে মিথ্যা সাব্যস্ত হয়েছে। কিন্তু ‘সহীহ নয়’ (لم يصح) বলার অর্থ হলো হাদীসটির প্রমাণ পাওয়া যায়নি। তাই প্রমাণ না পাওয়া থেকে মিথ্যার প্রমাণ স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না।
📚 তথ্যসূত্র: আল-মাসনূউ ফি মা‘রিফাতিল হাদীসিল মাওজূ‘, পৃষ্ঠা ৪৪, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত।
অভিমত: ৭
কোনো হাদীস প্রকৃতপক্ষে সহীহ না-ও হয়, তবুও কেবল এই ভিত্তিতে তাকে ‘দ্বঈফ’ বা অগ্রহণযোগ্য বলা যায় না। কারণ, ‘সহীহ’ হাদীসের পরের স্তর হলো ‘হাসান’। সুতরাং, যখন কোনো হাদীস সম্পর্কে বলা হয় “এটি সহীহ নয়”, তখন তার দ্বারা এ অর্থ উদ্দেশ্য নয় যে, সেটি ‘হাসান’ হাদীসও নয়। বরং অনেক ক্ষেত্রে এমন হাদীস ‘হাসান’ হিসেবে গ্রহণযোগ্য হয় এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে দলিলরূপে গণ্য হয়।
এ ধরনের বহু হাদীস সহীহ মুসলিম, অন্যান্য হাদীস গ্রন্থ এমনকি সহীহ বুখারী-তেও বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনায় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মুহাদ্দিস, ফকীহ, ইমাম মুহাম্মদ বিন আমীর আল-হাজ আল-হালাবী (রহিমাহুল্লাহ) তিনি বলেন:
قول الترمذى" لا يصح عن النبي في هذا الباب شيء " انتهى لا ینفى وجود الحسن و نحوه والمطلوب لا يتوقف ثبوته على الصحيح، بل كما يثبت به يثبت بالحسن ايضا
অনুবাদ:- ইমাম তিরমিযি রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: এই অধ্যায়ে রাসূলুল্লাহ ﷺ থেকে কোনো সহীহ হাদীস প্রাপ্ত হয়নি" এই বক্তব্য দ্বারা হাসান হাদীস বা তার অনুরূপ গ্রহণযোগ্য হাদীসসমূহের অস্বীকৃতি উদ্দেশ্য নয়। কারণ, কোনো বিষয়ে প্রমাণিত হওয়া কেবল সহীহ হাদীসের ওপর নির্ভরশীল নয়। বরং যেভাবে কোনো বিষয় সহীহ হাদীসের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়,
তদ্রূপ হাসান হাদীসের মাধ্যমেও তা প্রমাণিত হতে পারে।
📚 তথ্যসূত্র: হিলইয়া শারহ মুনইয়া (মুদ্রক: পোরবন্দর ভারত)
অভিমত:- ৮
আল্লামা মুল্লা আলী কারী হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
لَا يَلْزَمُ مِنْ عَدَمِ صِحَتِهِ ثُبُوتُ وَضْعِهِ وَغَايَتُهُ أَنَّهُ ضَعِيفٌ
অনুবাদ:- আমার বক্তব্য হলো- এ হাদীসটিকে সহীহ বলা না গেলেও, এটিকে বানোয়াট (মাওযূ) বলা ঠিক নয়। সর্বোচ্চ বলা যেতে পারে, এটি দুর্বল (দ্বঈফ) হাদীস মাত্র।
📘 গ্রন্থ: আসরারুল মারফূআহ, খণ্ড: ১, পৃষ্ঠা: ৪৭৪,প্রকাশনী: মুʼআস্সাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত।
অভিমত:- ৯
আল্লামা মুল্লা আলী কারী হানাফী (রহিমাহুল্লাহ) বলেন:
وَقَالَ ابْنُ الْهُمَّامِ : وَقَوْلُ مَنْ يَقُولُ فِي حَدِيثٍ أَنَّهُ لَمْ يَصِحَ إِنْ سَلِمَ لَمْ يُقْدَحُ : لِأَنَّ الْحُجَّةَ لَا تَتَوَقَّفُ عَلَى الصِّخَةِ، بَلِ الْحَسَنُ كَافٍ - فصل الثاني من باب: ما يجوز من العمل في الصلاۃ۔
অনুবাদ:- ইমাম কামালুদ্দীন মুহাম্মদ ইবনু হুমাম রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: কোনো হাদীস সম্পর্কে যদি কোনো মুহাদ্দিস মন্তব্য করেন যে সেটি সহীহ নয়, তাহলেও তিনার কথাকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করা হলেও এতে কোনো আপত্তি নেই। কারণ শরিয়তের দলীল হিসেবে কোনো হাদীস গ্রহণযোগ্য হওয়ার জন্য শুধুমাত্র ‘সহীহ’ হওয়াই একমাত্র শর্ত নয়; বরং যদি কোনো হাদীস সনদের দিক থেকে ‘হাসান’ পর্যায়েরও হয়, তাহলে সেটিও শরিয়তের দলীল হিসেবে যথেষ্ট বিবেচিত হয়।
📘 মিরকাতুল মাফাতীহ, তৃতীয় খণ্ড , পৃষ্ঠা: ৭৭, হাদীস নং: ১০৮
উপরোক্ত পর্যালোচনা দ্বারা দিবালোকের ন্যায় সুস্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, যখন কোনো ইমাম বা হাদীসবিশারদ কোনো হাদীস সম্পর্কে বলেন “এই হাদীসটি সহীহ নয়” তাহলে তিনার এ মন্তব্য থেকে হাদীসটিকে জাল (বানোয়াট) বা মাওদ্বু বলে গণ্য করা যাবে না।
কারণ হাদীসশাস্ত্রে হাদীসের গ্রহণযোগ্যতা একাধিক স্তরে ভাগ করা হয়েছে। সহীহ হাদীস সর্বোচ্চ স্তরে থাকলেও, তার নিচেই রয়েছে 'হাসান' ও 'যঈফ' পর্যায়ের হাদীস। কোনো হাদীস যদি সহীহ না-ও হয়, তাহলেও তা দুর্বল বা হাসান পর্যায়ে থাকতে পারে। তবে এ থেকে সরাসরি জাল (বানোয়াট) বা মাওদ্বু বলে দেওয়া নিরেট মূর্খতার পরিচয়।
অপরপক্ষে, যদি কোনো হাদীস সত্যিই জাল বা মাওদূ হতো, তবে হাদীসবিদগণ তা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতেন, যেমন: “এই হাদীসটি জাল” বা “এটি মাওদূ হাদীস” বলে তারা নির্দ্বিধায় মন্তব্য করতেন।
সুতরাং, “এই হাদীসটি সহীহ নয়” এই বক্তব্য থেকে কোনো হাদীসকে জাল বা বাতিল বলে আখ্যায়িত করা একেবারেই অগ্রহণযোগ্য ও হাদীসশাস্ত্রের মৌলিক নীতিমালার পরিপন্থী।
Comments -