ক্বোরআন ও হাদীস থাকা সত্ত্বেও ইমাম কেন মানবো?
ক্বোরআন ও হাদীস থাকা সত্ত্বেও ইমাম কেন মানবো?
মুফতী আবু বকর মিসবাহী
(শাইখুল হাদীস মেটিয়াব্রূজ, কোলকাতা)
ক্বোরআন ও সুন্নাতে দুই ধরনের বিধান রয়েছে:
কিছু হুকুম দৃঢ় ও সুস্পষ্ট যার মধ্যে কোন অস্পষ্টতা, বিভ্রান্তি, বা বৈপরীত্য নেই এবং যে কেউ সেগুলি পড়ে কোন বিভ্রান্তি ছাড়াই সহজেই এর অর্থ বুঝতে পারবে। যেমন নামায, রোজা, হজ ও যাকাতের ফরজ হওয়ার বিষয়গুলি, ব্যভিচার, মদপান, চুরি-ডাকাতি ,খুন ও ঝগড়া ফাসাদের হারাম হওয়ার বিষয়গুলি।
আর ক্বোরআন ও সুন্নাহর অনেক এমন বিধান রয়েছে যাতে অস্পষ্টতা পাওয়া যায়। যেমন ঈবাদত ও মুয়ামলার ফুরুয়ী বিষয়াদি।
ক্বোরআন ও সুন্নাহ থেকে এই ধরনের হুকুম সমূহ বের করার দুইটি উপায় রয়েছে:
(১) এক্ষেত্রে আমরা আমাদের নিজস্ব উপলব্ধি এবং অন্তর্দৃষ্টির প্রতি বিশ্বাস করে এই ধরনের বিষয়ে নিজেরাই সিদ্ধান্ত নিয়ে তার উপরে আমল করা ।
(২) অন্য উপায় হল, এ ধরনের বিষয়ে নিজে সিদ্ধান্ত না নিয়ে আদি শতাব্দীর জলিল-উল-ক্বদর পূর্বপুরুষদের উপলব্ধি ও অন্তর্দৃষ্টির ওপর আস্থা রাখা এবং তাঁরা যা বুঝেছেন সে অনুযায়ী আমল করা।
যেহেতু সাধারণ মুসলমানদের শরীয়তের বিধি-বিধান অনুধাবন করে ক্বোরআন-হাদীস থেকে মাসায়েল বের করার ক্ষমতা নেই, সেহেতু আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের ঐকমত্য রয়েছে যে,শারয়ী আহকাম ও মাসায়েলের ব্যাখ্যার জন্য চার ইমাম (ইমামে-আযম আবু হানিফা, ইমাম শাফেয়ী, ইমাম মালিক ও ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহিমাহুমূল্লাহ) এর মধ্যে থেকে কোন এক জনের অনুসরণ করা ওয়াজিব। যেহেতু উল্লিখিত ইমামগণ তাদের তাকওয়া, তপস্যা, ঈমান ও সততা, জ্ঞান ও চিন্তা ও চরিত্রের দিক থেকে প্রথম শতাব্দীর সর্বোচ্চ অবস্থান ও মর্যাদার অধিকারী, তাই তাঁরা অত্যন্ত উদ্যম, সততা ও যোগ্যতার সাথে সমস্যার সমাধান করেছেন। উম্মাহর সুবিধার্থে ক্বোরআন ও সুন্নাহর আলোকে মাসায়েল সংকলন করেছেন এবং ইসলামী শরীয়তের এমন নীতি ও বিধি-বিধান বেঁধেছেন যা সাধারণ মুসলমানদের জন্য দ্বীন বোঝা এবং শরীয়তের বিধি-বিধান অনুসরণ করা সহজ করেছে। বহু শতাব্দী ধরে ইসলামী পণ্ডিতগণ তাঁর বক্তব্যের উপর ফাতওয়া জারি করে আসছেন।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন :
فَسْئَلُوْٓا اَهْلَ الذِّکْرِ اِنْ کُنْتُمْ لَا تَعْلَمُوْنَ.
অর্থ:- সুতরাং জ্ঞানীদের জিজ্ঞাসা কর, যদি তোমরা না জানো।
(সূরা নাহল, আয়াত নম্বর : ৪৩)
একজন ইমাম বা মুজতাহিদকে অনুকরণ করার অর্থ এই নয় যে তাকে নিজের দ্বারা বাধ্যতামূলক হিসাবে অনুসরণ করা হচ্ছে বা তাকে শরীয়তের (আইন প্রণেতার) মর্যাদা প্রদান করা হচ্ছে এবং তিনি যা বলেছেন তা ওয়াজিব বলে বিবেচিত হচ্ছে, বরং এর অর্থ কেবল ক্বোরআন ও সুন্নাহর অনুসরণ করা। তবে ক্বোরআন ও সুন্নাহর অর্থ বোঝার জন্য, আমরা তাঁদেরকে আইনের ব্যাখ্যাকারী হিসাবে তাদের দেওয়া ব্যাখ্যার উপর নির্ভর করি।
চার ইমামের একজনের পদ্ধতি অনুযায়ী শরীয়তের বিধান পালন করাকে (তাক্বলীদে-শাখ্সি) ব্যক্তিগত অনুকরণ বলে।
হযরত শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী (রহিমাহুল্লাহ) ব্যক্তিগত অনুকরণের শরয়ী মর্যাদা সম্পর্কে বলেন :
أنَّ الاُمَّةَ قَدْ اجْتَمَعَتْ عَلَی اَنْ یَعْتَمِدُوْا عَلَی السَلَفِ فِیْ مَعْرَفَةِ الشَرِیْعَةِ، فَالتَّابِعُوْنَ اعْتَمَدُوْا فِیْ ذَلِکَ عَلَی الصَحَابَةِ، وَ تَبْعُ التَابِعِیْنَ اعْتَمَدُوْا عَلَی التَّابِعِیْنَ، وَ هَکَذَا فِیْ کُلِّ طَبَقَةٍ إعْتَمَدَ العُلَمَاء ُ عَلَی مِنْ قَبْلِهِمْ
(شاہ ولی ﷲ، عقد الجید،1: 31)
অর্থাৎ: উম্মত একমত হয়েছে যে, শরীয়তের (ফুরুয়ী মাসায়েল ) বোঝার জন্য পূর্ববর্তীদের ওপর আস্থা রাখতে হবে। তাবেয়ীনগণ এ ব্যাপারে সাহাবায়ে কেরামের উপর আস্থা রাখতেন এবং তাবে_তাবেয়ীনগণ তাবেঈনদের উপর আস্থা রাখতেন। একইভাবে প্রত্যেক যূগের ওলামায়ে-কেরামগন তাদের পূর্ববর্তীদের উপর নির্ভর করতেন।
তাকলীদে -শাখসি ওয়াজিব হওয়ার একটি সুস্পষ্ট উদাহরণ হজরত উসমান গনি(رضي الله عنه )-এর শাসনামলে কোরআন সংগ্রহের ঘটনা, যখন তিনি পবিত্র কোরআনের একটি লিপি নির্ধারণ করেছিলেন।
হজরত উসমান গনী(رضي الله عنه )-এর আগে পবিত্র কোরআন শরিফ যে কোনো লিপি অনুযায়ী লেখা যেত, কারণ বিভিন্ন পাণ্ডুলিপিতে সূরাগুলোর ক্রম ভিন্ন ছিল এবং এই ক্রম অনুযায়ী পবিত্র ক্বোরআন লেখা জায়েয ছিল, কিন্তু হজরত উসমান গণি রাদিয়াল্লাহু আনহু উম্মাহর সামষ্টিক সুবিধার পরিপ্রেক্ষিতে এই অনুমতি বাতিল করে পবিত্র ক্বোরআনের একটি লিপি ও বিন্যাস নির্ধারণ করে উম্মতকে এই ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ করেছিলেন এবং তা অনুসরণের ব্যাপারে উম্মতের মধ্যে ঐক্যমত ছিল। (بخاری، الصحیح، کتاب فضائل القرآن، باب جمع القرآن، 4 1908، رقم: 4702)
চারটি ইমামের মধ্যে একটি ইমামের অনুসরণ করার উপকারিতা হলো সাধারণ মুসলমান বিভক্তি ও বিশৃঙ্খলা থেকে রক্ষা পাবে। যদি নিরঙ্কুশ অনুকরণের অনুমতি দেওয়া হয় এবং প্রত্যেক ব্যক্তিকে যেকোন বিষয়ে তার ইচ্ছামত যে কোন ইমামের অনুসরণ করার অধিকার দেওয়া হয়, তাহলে এই ধরণের বাণী সংগ্রহ করে একটি ধর্ম গড়ে তোলা যেতে পারে যেখানে ধর্মটি কামনা-বাসনার খেলনা হয়ে যাবে , যা যে কোন ভাবেই সমর্থন করা যাবে না।
এখন ফোক্বাহায়ে-কেরামগণের মতে প্রয়োজন তাক্বলীদে শাখসী (ব্যক্তিগত অনুকরণ) এবং একজন মুজতাহিদের প্রতি আস্থা রাখা এবং প্রতিটি বিষয়ে তাঁর অনুসরণ করা যাতে মানুষের আত্মা হালাল-হারামের বিষয়ে বিপর্যয়ের সুযোগ না পায়।
মহানবী স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাহাবায়ে কেরাম, তাঁর বাহ্যিক জীবনে যেসব সমস্যার সম্মুখীন হতেন, সে সম্পর্কে রসূলুল্লাহ স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে জিজ্ঞাসা করে নিতেন। যদি তাঁকে(স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)প্রশ্ন করা সম্ভব না হতো, তখন নবীজির সাহাবীগণ ইজতিহাদ করতেন এবং শরীয়তের বিধানের উপর আমল করতেন।
ইজতিহাদের আসল দলিল প্রসিদ্ধ হাদীস শরীফ দ্বারা প্রমাণিত :-
عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ رَضِیَ اللهُ تَعَالىٰ عَنْهُ: أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ تَعَالىٰ عَلَيْهِ وَاٰلِهٖ وَسَلَّمَ لَمَّا بَعَثَه‘ إِلَى الْيَمَنِ قَالَ:’’كَيْفَ تَقْضِىْ إِذَا عَرَضَ لَكَ قَضَاءٌ؟‘‘ قَالَ: أَقْضِىْ بِكِتَابِ اللهِ قَالَ: ’’فَإِنْ لَّمْ تَجِدْ فِیْ كِتَابِ اللهِ؟‘‘ قَالَ:فَبِسُنَّةِ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ تَعَالىٰ عَلَيْهِ وَاٰلِهٖ وَسَلَّمَ قَالَ: ’’فَإِنْ لَّمْ تَجِدْ فِیْ سُنَّةِ رَسُوْلِ اللهِ؟‘‘ قَالَ: أَجْتَهِدُ رَأْيِیْ وَلاَ آلُوْ قَالَ: فَضَرَبَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ تَعَالىٰ عَلَيْهِ وَاٰلِهٖ وَسَلَّمَ عَلٰى صَدْرِهٖ وَ قَالَ: ’’أَلْحَمْدُ لِلّٰهِ الَّذِيْ وَفَّقَ رَسُوْلَ رَسُوْلِ اللهِ لِمَا يَرْضٰى بِهٖ رَسُوْلُ اللهِ‘‘.(رواه الترمذی و أبو داؤد و الدارمی
অর্থাৎ:- মু’আয ইবনু জাবাল (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) কতিপয় সঙ্গীর সূত্রে বর্ণিত। রসূলুল্লাহ স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন তাকে ইয়ামেনে পাঠালেন তখন বললেনঃ তোমার নিকট যখন কোন মোকদ্দমা আনা হবে, তখন তুমি কিসের ভিত্তিতে এর ফায়সালা করবে? তিনি বললেন, আল্লাহর কিতাব মোতাবেক। নবী স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি যদি আল্লাহর কিতাবে এর কোন ফায়সালা না পাও? মু’আয (রাদ্বিয়াল্লাহু আনহু) বললেন, তাহলে রসূলুল্লাহ স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত অনুযায়ী।
নবী স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেনঃ তুমি যদি রসূলুল্লাহ স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত এবং আল্লাহর কিতাবে এর ফায়সালা না পাও? মু’আয বললেন, তাহলে আমি ইজতিহাদ করবো এবং অলসতা করবো না। তখন নবী স্বল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মু’আযের বুকে হাত মেরে বললেনঃ সকল প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি তাঁর রসূলুল্লাহ স্বল্লল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতিনিধিকে আল্লাহর রাসূলের মনঃপুত কাজ করার তৌফিক দিয়েছেন। (আবু দাউদ শরীফ, হাদীস: ৩৫৯২)
উপরোক্ত হাদিস দ্বারা যেমনিভাবে ইজতেহাদ প্রমাণিত ঠিক তেমনি পরোক্ষভাবে তাকলীদ টাও বিদ্যমান। কারণ সাই্যয়েদুনা মূ'ওয়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহু ইয়ামানে আসার পরে একাধিক মাসায়েল ইজতিহাদের মাধ্যমে প্রদান করেছিলেন, যে মাসায়েল গুলো বহু সাহাবায়ে কেরাম সেই যুগে আমলও করেছেন। তো সেক্ষেত্রে তারাও হযরত মু,য়াজ ইবনে জাবাল রাদিয়াল্লাহু তা'আলা আনহুর গবেষণা কৃত মাসায়েলের সমাধানের জন্য তাক্বলিদ করেছেন।
Comments -